বুকারের দীর্ঘ তালিকায় ১৩টি উপন্যাস

Website-Hero-Image
নোবেল পুরস্কারের পর সবচেয়ে বেশি মর্যাদার ‘ম্যান বুকার পুরস্কার’। এটি কথা-সাহিত্যে প্রতিবছর দেওয়া হয়। গত ২৩ জুলাই প্রকাশ করা হয়েছে দীর্ঘ তালিকায় মনোনীত ১৩টি উপন্যাসের নাম। এবারের তালিকায় ভৌগলিক বৈচিত্র্য দেখা গেলেও নারী লেখকদের স্বল্প উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হবে এই পুরস্কারের হ্রস্ব তালিকা। আর ১৪ অক্টোবর ঘোষণা করা হবে চুড়ান্ত পুরস্কার।

দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ

অস্ট্রেলীয় ঔপন্যাসিক রিচার্ড ফ্লেনাগানের উপন্যাস ‘দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ’। এই উপন্যাসের কাহিনী যতই এগিয়ে যায় প্রেম, যুদ্ধ, মৃত্যু আর সত্যের ভিন্ন ভিন্ন স্তর খুলে যায় পাঠকের সামনে। থাই-বার্মা ভৌগলিক পটভূমিতে ১৯৪৩ সালের ইতিহাস উঠে এসেছে অস্ট্রেলীয় সার্জন ডরিগো ইভানসের পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। চাচার অল্পবয়সী স্ত্রীর সাথে তার নিসিদ্ধ প্রেম তাকে অহরহ তাড়া করে বেড়ায়। এছাড়া তার সংগ্রামের অনেকখানি জুড়ে থাকে তার অধীনস্ত মানুষদের ক্ষুধা, কলেরা এবং অত্যাচার থেকে রক্ষা করার কাজ। প্রচণ্ড আবেগ, বিভীষিকা আর পরিহাসমূলক ট্র্যাজেডিতে ভরা ফ্লেনাগানের এই উপন্যাস।

দ্য লাইভস অব আদারস

ভারতীয় লেখক নীল মুখার্জির উপন্যাস ‘দ্য লাইভস অব আদারস’ এর পটভূমি ১৯৬০-এর দশকের কলকাতা। তবে বর্তমান সময়ের ওপরেও এর আলো পড়েছে বেশ স্পষ্টভাবেই। উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যে আপাত ভৌগলিক নৈকট্য দেখা গেলেও তাদের মধ্যে বিরাজ করে বিশাল আবেগী দূরত্ব। উপন্যাসে ঘোষ পরিবারের সদস্যদেরও জানার প্রয়োজন হয়ে পড়ে তাদের জীবনের সঙ্গে অন্য সবার জীবন কীভাবে জড়িয়ে আছে। এখানে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে ধনী-দরিদ্র, যুবা-বৃদ্ধ ও ঐতিহ্য-আধুনিকতার মধ্যকার  ফারাকগুলো। ঘটনাবলীর মধ্যে বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক দৃশ্যমান হলেও পরবর্তীতে সবগুলোই ঘনিষ্ঠ প্রাসঙ্গিকতায় জড়িয়ে যায়।

হিস্ট্রি অব দ্য রেইন

নায়াল উইলিয়ামসের উপন্যাস ‘হিস্ট্রি অব দ্য রেইন’। তার এই উপন্যাস সম্পর্কে দ্য টাইমসে বলা হয়েছে, ‘তাঁর গদ্য জোছনা-ধোয়া, কবিতা-স্নাত।’ এমন ভিন্ন স্বাদের গল্পের মধ্যে উঠে এসেছে পারিবারিক ইতিহাস। বিশ বছর বয়সী রুথ সোয়েইনের চোখে দেখা যাচ্ছে সোয়েইন পরিবারের চার প্রজন্মের চেহারা। এখানে সাহিত্যের, বিশেষ করে কবিতার প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

হাউ টু বি বোথ

তালিকার আরেক উপন্যাস হলো ব্রিটিশ লেখিকা আলি স্মিথের ‘হাউ টু বি বোথ’। দ্য টেলিগ্রাফে বলা হয়েছে, ‘এ উপন্যাসের কণ্ঠস্বর চমকে দেয়ার মতো এবং সুস্পষ্টরূপে প্রাণবন্ত- যেন পাঠকের কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলছে।’ শিল্পের বহুমুখিতার কথা বলা হয়েছে এই উপন্যাসে। আঙ্গিক, সময়, সত্য আর কথাসাহিত্যের মধ্যে কথোপকথনের নামই হলো আলি স্মিথের হাউ টু বি বোথ।

জে

দীর্ঘ তালিকার আরেক উপন্যাস হলো ব্রিটিশ লেখক হাওয়ার্ড জ্যাকবসনের ‘জে’। এ উপন্যাসের কাহিনী স্থাপিত হয়েছে ভবিষ্যতে। সেখান থেকে মনে করা হয় অতীত হলো একটা বিপজ্জনক দেশ; সেখানে যাওয়া যায় না; সে সম্পর্কে কোনো আলোচনাও চলে না। এ উপন্যাসটি মূলত একটি প্রেমের কাহিনী; ঘটনাবলী এক দিকে কোমলতায় ভরা অন্য দিকে ভয়াবহও বটে। জ্যাকবসনের অন্যান্য উপন্যাস থেকে এটি আলাদা এবং এটিকে তুলনা করা হয়েছে জর্জ ওরঅয়েলের ‘নাইনটিন এইটি ফোর’ এবং অলডাস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়াল্ড’ এর সাথে।

অরফিও

আমেরিকার ঔপন্যাসিক রিচার্ড পাওয়াসের উপন্যাসের নাম ‘অরফিও’। বর্তমান থেকে অতীতের দিকে পালিয়ে বেড়ানো এক ব্যক্তির কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে অরফিওতে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সঙ্গীতজ্ঞ পিটার এলস একদিন বাইরে যাওয়ার জন্য দরজা খুলে দেখতে পায় চৌকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ। তাঁর নিরীক্ষাধর্মী সঙ্গীতই নাকি পুলিশের সন্দেহের কারণ। পরে সে পুলিশের চোখ ফাঁকি দেয়ার জন্যই ফেরার হয়। এলস তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরিকল্পনা করে চারপাশের শব্দ সম্পর্কে সাইকে সচেতন করার মাধ্যমে সিকিউরিটি স্টেটের সাথে তার বিরোধিতাকে কীভাবে শিল্পের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়।

দ্য ব্লেজিং ওয়ার্ল্ড

তালিকায় রয়েছে আমেরিকার আরেক ঔপন্যাসিক সিরি হাস্টভেদের ‘দ্য ব্লেজিং ওয়ার্ল্ড’। এ উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে এসেছে শিল্পের ইতিহাস, আমেরিকার উপমহাদেশীয় দর্শন,  মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি। এছাড়া এখানে আনা হয়েছে জগতের দৃষ্টিতে পড়ার জন্য নারীর সংগ্রাম ও বাসনার কথা।

দ্য বোন ক্লকস

আমেরিকার ঔপন্যাসিক ডেভিড মিটশেলকে বলা হয় লগোফোন এবং টাইম ট্রাভেল মাস্টার। তাঁর উপন্যাস ‘দ্য বোন ক্লকস’ স্থান পেয়েছে বুকার পুরস্কতারের দীর্ঘ তালিকায়। উপন্যাসটির প্রতিটি অংশে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা আর সুদূর কল্পনার মিশেল। বলা হয়ে থাকে এটাই তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উপন্যাস। প্রাত্যহিক জীবনের সৌন্দর্য আর অস্বাভাবিক বিস্ময়ের সাথে উঠে আসে ক্যাম্ব্রিজের বৃত্তি পাওয়া উচ্চাভিলাষী এক যুবকের কথা, দখলকৃত ইরাকে রিপোর্টারের পেশায় নিয়োজিত মানসিক দ্বন্দ্বে পীড়িত এক বাবার কথা, বেস্ট সেলার লিস্ট থেকে ছিটকে পড়া মধ্যবয়সী এক নির্বাসিত লেখকেরও কথা। মধ্যযুগের সুইস আল্পস থেকে উপনবিংশ শতাব্দীর অস্ট্রেলীয় জঙ্গল, সাংহাইয়ের হোটেল থেকে ম্যানহ্যাটানের অদূর ভবিষ্যতের টাউনহাউস পর্যন্ত বিস্তৃত মানুষের গল্পের কথা একই মুহূর্তে একই সূতোয় গাঁথা হয়েছে এ উপন্যাসে।

আস

দীর্ঘ তালিকার অন্তভূক্ত ইংরেজ লেখক ডেভিড নিকোলসের উপন্যাসের নাম ‘আস’। মধ্যবয়সীদের পরিণয় আর বিচ্ছেদের কথা তুলে ধরা হয়েছে এ উপন্যাসে। তবে রসের ঘটতি নেই, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া বোধেরও কমতি নেই। লেখক হওয়ার আগে অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন ডেভিড নিকোলস। নাটকের চিত্রনাট্য লিখেছেন। এভাবেই শুরু করেছেন উপন্যাস লেখা। এ উপন্যাসে তিনি বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এবং সন্তানের জন্মদাতা হিসেবে তাদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের কাহিনীতে দেখা যায় প্রধান চরিত্র ডগলাস পিটারসনের ছেলে আলবি কলেজে পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়ে যাবে। একুশ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটানোর পর পিটারসনের স্ত্রী কনি পরিকল্পনা করছে ছেলে বিদায় হলে সেও পিটারসনকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু তাদের চলে যাওয়ার আগে এক সাথে গ্রীষ্মাবকাশ কাটানোর সুযোগ রয়েছে পিটারসনের হাতে। ইউরোপের বিভিন্ন শহর-নগর ঘুরবে তারা। পিটারসনের পরিকল্পনা হলো ভ্রমণের ওই সময়ের মধ্যেই তার স্ত্রীর মনে ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে পারবে; ছেলের সাথেও তার সম্পর্ক জোড়া লাগবে। ডেভিড নিকোলসের এরকম চমৎকার কাহিনীর নাম ‘আস’।

দ্য ওয়েক

ইংরেজ লেখক পল কিংসনর্থের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ওয়েক’। এ উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয়েছে নরমাদের ইংল্যান্ড জয়ের সময়ে, ১০৬৬ সালে। উপন্যাসের ভাষা ব্যবহারের সময় চেষ্টা করা হয়েছে বিশেষ শৈল্পিক চেহারা দানের। আধুনিক পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য পুরনো ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এ উপন্যাসে।

দ্যা ডগ

বিচ্ছেদ আর হৃদয় ভাঙার গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে আইরিশ-আমেরিকান ঔপন্যাসিক যোসেফ ও’নিলের উপন্যাস ‘দ্যা ডগ’ এর কাহিনী। দীর্ঘদিনের বান্ধবীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার পর নামহীন প্রধান চরিত্র নিউ ইয়র্ক থেকে চলে যায় দুবাইয়ে। সেখানে শুরু হয় তার সংগ্রামময় জীবন। সে যতই চেষ্টা করে নিজের মতো থাকতে ততই যেন জড়িয়ে পড়ে পরধীনতার জালে। নগর সভ্যতা মানুষের নৈতিক জীবনে কতখানি উন্নতি এনেছে তারই এক সরস বয়ান হলো ‘দ্যা ডগ’।

টু রাইজ এগেইন অ্যাট আ ডিসেন্ট আওয়ার

আমেরিকান ঔপন্যাসিক যোসুয়া ফেরিসের উপন্যাস ‘টু রাইজ এগেইন অ্যাট আ ডিসেন্ট আওয়ার’ রয়েছে এই দীর্ঘ তালিকায়। এ উপন্যাসে রয়েছে আধুনিক জীবনের গভীর রহস্যের কথা। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র পল রুকের ব্যক্তিত্ব স্ববিরোধিতায় ভরা। সে এই জগত সংসারকে ভালোবাসে। কিন্তু এখানে কীভাবে জীবন যাপন করতে হয় তা জানে না। আইফোনের প্রতি রয়েছে তার প্রবল আসক্তি; ডেন্টিস্ট হলেও নিকোটিনে আসক্ত সে; নাস্তিক হওয়ার বাতিক থাকলেও ঈশ্বরকে ছাড়তে পারে না।

টু রাইজ এগেইন অ্যাট আ ডিসেন্ট আওয়ার

আমেরিকান লেখিকা ক্যারেন জয় ফাওলারের দশম উপন্যাসের নাম ‘উই আর অল কমপ্লিটলি বিসাইড আওয়ারসেলভস’। ১৯৩০-এর দশকের একটি বাস্তব ঘটনার আলোকে তৈরি হয়েছে এ উপন্যাসের কাহিনী। দুজন বিজ্ঞানী দম্পতি তাদের ছেলের সাথেই বড় করতে থাকেন একটা শিম্পাঞ্জির বাচ্চা। কিন্তু তাদের গবেষণা বেশিদিন চলতে পারে না। গুজব ছড়ায় তাদের বাচ্চা ছেলেটা নাকি শ্পিাঞ্জির মতো আচরণ শিখছে। পারিবারিক বন্ধন ও সম্পর্ক নিয়ে রচিত হয়েছে এ উপন্যাস। অনেক সময় অভিভাবকদের সচেতনতার ভেতরও গলদ থেকে যেতে পারে- তেমনই এক হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া কাহিনী হলো ‘উই আর অল কমপ্লিটলি বিসাইড আওয়ারসেলভস’।

 

EH

পছন্দের আরো পোস্ট