সুইডেনে লেখাপড়া

স্বর্ণক শাহী।

তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উচ্চশিক্ষার আর্ন্তজাতিকীকরণ। দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা আর কিছুসংখ্যক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অতি-ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির কারণে অভিভাবকেরাও এখন তাঁদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় বিদেশে পাঠাতে মনোযোগী হয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে অজ্ঞতা আর সচেতনতার অভাবে অনেকেই হচ্ছেন ভোগান্তির বা মধ্যস্বত্বভোগীদের লালসার শিকার। অথচ সামান্য সচেতনতা আর আগ্রহ থাকলে নিজেই সম্পন্ন করা সম্ভব ভর্তিপ্রক্রিয়ার পুরো ধাপ।

শিক্ষাব্যবস্থার উন্নত মান ও ভবিষ্যৎ​ কর্মক্ষেত্রের চাহিদার কারণে সুইডেন বাংলাদেশি ছাত্রদের একটি ভালো গন্তব্য হতে পারে। উল্লেখ্য, পূর্বে উচ্চশিক্ষা ফ্রি থাকলেও সুইডেন ২০১১ সাল থেকে বিদেশি (নন-ইইউ) শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি আরোপ করেছে। তবে পাশাপাশি তারা স্কলারশিপের পরিধিও বাড়িয়ে দিয়েছে। সুইডেনে বছরে দুইটি এডমিশন রাউন্ড হয়। জানুয়ারি রাউন্ডে (অটাম সেশন) আবেদনকাল ১৬ অক্টোবর-১৫ জানুয়ারি আর আগস্ট রাউন্ডে (স্প্রিং সেশন) আবেদনকাল ১ জুন-১৫ আগস্ট।

আবেদন:

সুইডেনে ভর্তিপ্রক্রিয়া কেবল একটি অনলাইন এপ্লিকেশন সার্ভিসের (www.universityadmissions.se) মাধ্যমে সম্পন্ন হয়৷ এটা অত্যন্ত সহজ ও ঝামেলাবিহীন। একবার অ্যাকাউন্ট করলেই যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করা যায়। উল্লেখ্য, এই পোর্টাল ছাড়া সুইডেনে আবেদনের আর কোনো দ্বিতীয় পথ নেই। প্রথম ধাপে এখানে একটি অ্যাকাউন্ট করে ভর্তিপ্রক্রিয়া শুরু হলে আবেদন করতে হবে। পরবর্তী ধাপ হলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো। সঙ্গে আবেদনের কভার পৃষ্ঠা পাঠাতে হবে। ভুলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় কোনো কাগজপত্র পাঠানো যাবে না। সব ডকুমেন্ট পাঠানোর ঠিকানা হলো: University Admissions in Sweden, FE 20102SE-839 87 stersund SWEDEN.

উল্লেখ্য, পাঠানো সব ডকুমেন্টই স্ক্যান করে মূল সিস্টেমে অ্যাটাচ করা হবে৷ পরবর্তী সব আবেদনের জন্য কোনো কাগজ পাঠানোর দরকার নেই। ভর্তিপ্রক্রিয়ার পুরোটা ধাপে ওই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবেদনকরীর সঙ্গে যোগাযোগ করবে। সাধারণত দুই মাস পর প্রথম নোটিফিকেশন দেওয়া হয়, যাতে সম্মতি বা প্রত্যাখ্যান বাধ্যতামূলক। পরবর্তীতে আরেকটি নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়। ভর্তি আবেদন গৃহীত হলে ভিসার আবেদন করতে হয়। ভর্তি না হলেও একই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরবর্তী সময় আবেদন করা যায়।

আবেদন ফি:

অনলাইন আবেদনের পরবর্তী ধাপে ৯০০ ক্রোনার (প্রায় ১১ হাজার টাকা) অ্যাপ্লিকেশন ফি পরিশোধ করতে হয়। স্কলারশিপের আবেদন করার আগেই এই টাকা পরিশোধ করতে হবে। ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে পরিশোধিত না হলে আবেদন বিবেচিত হবে না।

স্কলারশীপ:

ভর্তি আবেদন সম্পন্ন করার পর স্কলারশিপ আবেদন করতে ভুলবেন না। বাংলাদেশিসহ ১২টি দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সুইডিস ইনস্টিটিউট স্কলারশিপ প্রোগ্রাম। প্রতি বছর ২০০ জনশিক্ষার্থী এই বৃত্তির জন্য মনোনীত হন। সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ করার পরও প্রায় ১ লাখ টাকার মতো মাসিক ভাতা দেওয়া হয় মনোনীত শিক্ষার্থীকে। আবেদনের জন্য ভিজিট করুন http://www.studyinsweden.se/Scholarships/SI-scholarships/
যেসব বিষয় এই প্রোগ্রামের আওতাভুক্ত জানতে পারবেন এখানে। http://www.studyinsweden.se/upload/studyinsweden_se/Documents/SI-Study-Scholarship-List-of-eligible-progams2013-14.pdf

লক্ষণীয়, SI ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক স্কলারশিপ সুবিধা রয়েছে। তাই চেষ্টা করুন যত বেশি সম্ভব আবেদন করা যায়। কারণ স্কলারশিপ আবেদন ফ্রি এবং এতে আপনার বৃত্তি পাওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে। তবে স্কলারশিপ আবেদনের সঙ্গে নির্দিষ্ট ফরম্যাটের CV আর Motivation Letter দিতে ভুলবেন না।

ভিসা আবেদন:

সর্বশেষ ধাপ ভিসা আবেদন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপনাকে ছাত্র বা ছাত্রীরূপে গ্রহণ করলে আইনগতভাবে আপনি ভিসা পাওয়ার দাবিদার। তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভিসার আবেদন করুন। ভিসা আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হলো সিলেকশন রেজাল্ট (যা আপনি আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে ডাউনলোড ও প্রিন্ট করবেন), মেডিকেল ইনস্যুরেন্স (শিক্ষাকাল এক বছরের চেয়ে কম হলে), পাসপোর্ট, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং ব্যাংক স্টেটম্যান্ট। আপনি যদি স্কলারশিপের জন্য মনোনীত না হন, তবে আপনার ১০ মাসের খরচ নিজ ব্যাংক হিসাবে দেখাতে হবে। মাসে ৭৩০০ ক্রোনার হিসেবে তা ৭৩,০০০ ক্রোনার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় নয় লাখ টাকা)। তবে স্কলারশিপ পেলে আপনার ব্যাংক বিবরণীর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ থেকে ভিসা প্রসেসিংয়ে ২-৪ মাস সময় লাগে। তাই সিলেকশন রেজাল্ট পাওয়া মাত্রই আবেদন করুন।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

একটি হলো, ইংরেজি ভাষা দক্ষতা। অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা না থাকায় ভুল করে থাকেন। সুইডেনে বিষয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যূনতম যোগ্যতা চাওয়া হয় IELTS 6.5 বা TOEFL 575। তবে স্কোর কম থাকলেও ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কারণ পূর্বঅভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব শিক্ষা যদি ইংরেজি মাধ্যমে হয় কিংবা কাজের ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, Motivation Letter বা Statement of Purposes. মনে রাখবেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি প্রদানের ক্ষেত্রে এটিকে বিশেষ বিবেচনা করে থাকে। হয়তো আপনার পূর্ব শিক্ষাগত যোগ্যতা আশানুরূপ নয়, কিন্তু একটি সুন্দর Statement of Purposes–এর কারণে আপনি ভর্তির জন্য বিবেচিত হতে পারেন। তাই এটি তৈরি করুন ভালোভাবে, কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে আপনার আগ্রহ, ভবিষ্যৎ​ কর্মপরিকল্পনা ইত্যাদি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরুন। তবে ২ পৃষ্ঠার অধিক না হওয়াই ভালো।

অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের Statement of Purposes–এর জন্য নিজস্ব ফরম্যাট রয়েছে । তা অনুসরণ করুন। সর্বোপরি গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিষয় নির্ধারণ। যতটা সম্ভব আপনার পূর্ববর্তী বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ে আবেদন করুন। আপনি একটি সেশনে সর্বোচ্চ চারটি মাস্টার্স বা আটটি ব্যাচেলর প্রোগ্রামে আবেদন করতে পারবেন। তাই বিষয় নির্ধারণে সচেতন হউন। উদাহরণস্বরূপ, সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে যদি আপনার গ্রাজুয়েশন থাকে, কম্পিউটার সায়েন্সে আবেদন করলে আপনার ভর্তির সম্ভাবনা থাকে না। এ ছাড়াও আপনার সর্বাধিক কাঙ্ক্ষিত বিষয় হতে শুরু করে ক্রমানুসারে বিষয়গুলোকে সাজান, কারণ ভর্তিপ্রক্রিয়ায় আবেদিত বিষয়গুলো ওপর হতে ক্রমানুসারে ভর্তির জন্য বিবেচনা করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, ১ নাম্বার অবস্থানে আবেদিত বিষয়ে আপনি ভর্তির জন্য বিবেচিত হলে নিচের ২,৩,৪ অবস্থানের বিষয়গুলো মুছে ফেলা হবে এবং বিবেচিত হবে না।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জন নয়, ব্যক্তিজীবনের জন্য বিশাল এক অভিজ্ঞতা, যা অর্জনে চাই যথাযথ আত্মবিশ্বাস আর নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া। হতাশ না হয়ে চেষ্টা করুন, বিজয় সুনিশ্চিত।
(Studying Software Development, Kristianstad University, Sweden)

পছন্দের আরো পোস্ট