স্মৃতির মাঠ ভেসে যায় প্রবল স্রোতে

পলি শাহীনা।

আজ ছিলো আধফোটা দিন। আধফোটা আলো, আধফোটা আকাশ। আজ কুয়াশা ঢেকে রেখেছিলো এ শহরকে। আজ আমার সন্ধ্যা নেমেছিলো জানালায় ঝুলে থাকা কুয়াশার শরীর বেয়ে। এমন দিনে মনের চারদেয়াল, স্মৃতির মাঠ ভেসে যায় প্রবল স্রোতে। শীত শীত অনুভূতি তীব্র হয়, দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে আছি ফায়ারপ্লেস ছুঁয়ে। চোখ বন্ধ শরীর কাঁপছে গভীর স্মৃতিঝড়ে।

দাদীর হাতে ম্যাচের কাঠি জ্বলছে না। আমাকে দেখেই হাসলো। কী বিশুদ্ধ হাসি! জড়ো করা শুকনো খড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া, অতঃপর মাটির উনুনের আঁচে সবাই একসঙ্গে বসে তাপ নেয়া। ফেলে আসা খাঁটি মধুর দিনগুলোতে আজ আচ্ছন্ন ছিলাম, ফায়ারপ্লেসের সামনে একা।

সঠিক সময় মনে পড়ছে না। তবে সেদিনও ছিলো এমন কুয়াশাজড়ানো দিন। মায়ের হাতের খিচুড়ি সঙ্গে হাঁসের মাংস। বহু বছর বাদে আজ আবার সে অমৃত সম ঘ্রাণ পেলাম। যে ঘ্রাণে গোটা দিন বিভোর ছিলাম।

তন্দ্রাঘোরে স্পষ্ট দেখতে পাই নানু খেজুর গুঁড়ের পায়েস রাঁধছেন। পায়েসের মৌ মৌ ঘ্রাণে রসুই ঘরের চারপাশে ঘুরঘুর করছি। তন্দ্রা ভেঙে পায়েসের মতো নানুর মিষ্টি হাসির পরশে ভেসে বেড়িয়েছি আজ অনন্তের পথে।

শিশিরে পা ডুবিয়ে আত্মমগ্ন হয়ে ছিলাম। আচমকা চোখে পড়ে গাছের নিচে একটা ছায়া কাঁপছে। ভারী কুয়াশার মধ্যে ছায়াটি অস্পষ্ট রয়ে যায়। অনেক বছর আগের ঝাপ্সা সে ছায়াটি আজ আমার ঘুম ঘুম চোখে ভালোলাগার উষ্ণতায় অবিরত ডানা ঝাপ্টায়।

ছোটবেলায় এমন ঘণ কুয়াশার দিনে আধো আলো আধো অন্ধকারে দলবেঁধে ফুল চুরি করতাম। সফলভাবে ফুল চুরি শেষে আমাদের সে কী হাসি-আনন্দ! আমাদের আনন্দ সকালের আলো হয়ে হেসে উঠতো। আজ এই শহরের ঝিরিঝিরি কুয়াশার ভেতর দিনভর আমি ফেলে আসা ভোরের হাসির শব্দ শুনেছি।

আমার ছোটবেলা, আমার গ্রাম, আমার দেশ, মনের ঘরে অহর্নিশি জ্বলে। আমি তাঁদের ছুঁয়ে বাঁচি। এমন কুয়াশা দিনে আমি শুধু স্মৃতির পাতা ওলটাতে থাকি। এমাথা হতে ওমাথা ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে নিজের ভেতর ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ঘোরে আবারো দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি।

উনুনের আঁচ, মায়ের হাতের খিচুড়ি, নানুর হাতের পায়েস, ছায়াঘেরা মায়া , ফুলের হাসি!
কী সুন্দর জীবন! কী মায়া মায়া গন্ধ! কী অদ্ভুত আনন্দ! কুয়াশা ঝরছে অবিরত!

পছন্দের আরো পোস্ট