পরিবারই প্রজন্মের প্রশিক্ষণালয়

মোবাশ্বেরা ওহী

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। পরিবার, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সমাজ শিশুদের যেসব জিনিসগুলো অনুকরণ করার সুযোগ করে দেয় সেসব জিনিসগুলোই তারা নিজের জন্য গ্রহণযোগ্য রূপ দিয়ে গ্রহণ করে নেয়। যার অর্থ হয়ে দাঁড়ালো, একজন শিশু সেটাই গ্রহণ করবে পরিবার তাকে যা শিক্ষা দিচ্ছে এবং সমাজ তাকে যা শিখতে বাধ্য করছে। একটি সমাজ ভালো এবং খারাপ দুইয়ের সংমিশ্রণে গড়া। কিন্তু সেই সমাজ থেকে একটা শিশু খারাপ না ভালো জিনিসগুলোর প্রতি ঝুঁকে পড়বে তার শিক্ষা সে পরিবার থেকেই পাবে। সুতরাং, একজন শিশু পরিবার থেকেই তার মূল শিক্ষা নিয়ে থাকে।

একজন মানুষকে ভালোভাবে পরখ করে কিছুটা হলেও তার পরিবারের মূল চরিত্রগুলোর কিছুটা বৈশিষ্ট্য আঁচ করা যায়। তার ভেতরে যদি নৈতিকতাবোধ থাকে, বুঝতে হবে পরিবারের মাধ্যমে সে নৈতিক স্বভাবটি তার মাঝে গেঁথে গেছে। আর যদি তার মাঝে অনৈতিক কাজ করার প্রবণতা থাকে তাহলে বুঝতে তার পরিবারের কারো মাঝে কিছুটা হলেও অনৈতিক কাজ করার স্বভাবটি লুকিয়ে রয়েছে, অথবা তার পরিবার তাকে সেসব অনৈতিক কাজে নিরুৎসাহিত করেননি।

শুধু কাগজে কলমে শিক্ষিত হলেই প্রকৃত শিক্ষা পাওয়া হয় না। প্রকৃত শিক্ষা পেতে হলে সর্বপ্রথম তার পরিবারের পক্ষ থেকে উচিত নৈতিক-অনৈতিক ব্যাপারে সঠিকভাবে জ্ঞানদান। পরিবার সচেতন হলে সে যে-ই হোক না কেনো তার মাঝে নৈতিকতার ভাব, লক্ষণ স্পষ্টভাবে ধরা দিবে। আর পরিবার সঠিক, সত্য-মিথ্যা, খারাপ-ভালো শিক্ষা প্রদানে উদাসীন হলে সে যে-ই হোক না কেনো সুযোগের অসৎ ব্যবহার করে, নৈতিকতার বুলি পেছনে ফেলে সেও অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়ে পড়বে।

বর্তমান সমাজ আজ অপরাধ হজম করতে করতে ক্লান্তপ্রায়। ইউটিউব, টুইটার, ফেইসবুক, সংবাদপত্র প্রভৃতি ঘাটলেই শুধু চোখে পড়ে অপরাধের ইতিহাস।অনেক নেতিবাচক খবরের মাঝে এই দু:সংবাদ ও বারংবার চোখে এসে ভিড়ে যে, কষ্টের টাকায় সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে বাবা-মা স্থান পায় বিদ্ধাশ্রমে।

তাদের বিবেকবোধ এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে তারা নামধারী শিক্ষিত হয়ে সমাজে বিচরণ করছে কিন্তু শিক্ষা রয়ে গেছে তাদের পায়ের তলায়। আজ সমাজে ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, মাদকাসক্তি, নিরপরাধে হত্যা ; এসব কখনোই বেড়ে যেতো না যদি পরিবারগুলো থেকে তারা ছোট ছোট অন্যায়গুলোর বিনিময়ে শান্তি পেয়ে আসতো। এর জন্য সম্পূর্ণভাবে পরিবার দায়ী।

সমাজ তো কেবল মানুষ এবং তাদের মতাদর্শ নিয়ে গড়ে উঠেছে। তাই কোনো অন্যায় শোধরাতে হলে পরিবারকেই তার আগত সদস্যদের জন্য, নতুন প্রজন্মের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে কি তারা শিক্ষা দিবে, কি তারা বর্জন করতে বাধ্য করবে।

বর্তমান বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে একটু বেশি সচেতন, পাশাপাশি কেউ কেউ এ ব্যাপারে কিছুটা উদাসীন ও বটে। বিশেষত, চাকুরিজীবী বাবা-মায়েরা সন্তানদের বেশি সময় দিতে পারেন না বলে নিজের ভেতরে অসহায়ত্ব ভাবটা পোষণ করে থাকেন। তাই তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে থাকেন যেন কোনোভাবেই সন্তানের কোনো কিছু অপূর্ণ থেকে না যায়। কিন্তু পাওয়ার পিছনে কষ্টের গল্পটা সন্তানদের কাছে প্রায়শই অজানা থেকে যায়।

এই না জানাটা তাদের বাস্তবতা থেকে খানিকটা দূরে সরিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য করে। কারণ, যখন তখন পেয়ে যায় বলে ‘কষ্ট’ নামক জিনিসটা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। এরকম কিছু ছোট ব্যাপার থাকে যেগুলো সন্তানদের বুঝতে দেওয়া প্রত্যেক বাবা-মায়ের কর্তব্য। তাছাড়া অতিরিক্ত আদরের বশে কখনোই সন্তানদের ছোট খাটো অন্যায়গুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক না। বরং অন্যায় থেকে বিরত থাকার জন্য সন্তান তার যত ছোটই হোক না কেনো তার প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত।

কারণ, ছোট ছোট অন্যায়গুলোই ধীরে ধীরে বড় বড় অন্যায়ে পদার্পণ করার সাহস জোগায়। ফলে সেটা জন থেকে কয়েকজনে সমাজে সে অন্যায়গুলো ভাইরাসের মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।

পরিবারহীন একটি শিশু পুরোপুরি অনিরাপদ। আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য ছন্নছাড়া শিশু রয়েছে যাদের বাবা-মা কেউ নেই অথবা দুটোর কেউ থাকলেও মানবেতর জীবনযাপন করে। তারা পরিবার বুঝে না কিংবা অভাব তাদের পরিবারের বন্ধনকে বুঝতেও দেয় না। তাদের কাছে পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটির মতোই মনে হয়।

দুমুঠো খাদ্যের আশায় তারা পরিবার ছাড়ে, লোকলজ্জার ভয় আড়াল করে রাখে। সে যখন কোনো ভালো কাজ করে তখন তার প্রতি উৎসাহ প্রদানে ও কেউ থাকে না, আর খারাপ কাজ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও সমাজের উচ্ছিষ্ট বানী ব্যতীত কিছুই জুটে না কপালে। কারণ তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই সেইসব শিশুরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু চরিত্র ধারণ করে নেয় যা তাদের চলার পথে বাধা প্রদান করে না।

ফলে অধিকাংশ শিশু জড়িয়ে পড়ে অপরাধবোধে। কারণ পরিবার তাদের বাঁধা দেয় না, তাই বিবেকবোধ ও সুপ্ত থাকে অনেকাংশে। আবার কিছু কিছু নিম্ন আয়ের পরিবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে কথা বলতেও ইচ্ছা পোষণ করে না, তাদের জন্য শুধু বেঁচে থাকাটাই মূখ্য বিষয়।

সমাজ একজন মানুষকে বদলাতে পারে না, যদি না পরিবার তাকে বদলে যেতে সাহায্য করে। সমাজ একজন মানুষকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে না যদি না সে তার পরিবার থেকে প্রাপ্ত নৈতিক শিক্ষা মনে প্রাণে ধারন করে। তাই বলাই যায়; সমাজের সমস্ত অপরাধগুলোর উস্কানিতে পরিবার সবার আগে দায়ী, তারপর বাকি কারণগুলো।

পছন্দের আরো পোস্ট