টেকসই ও গুনগত শিক্ষার মানোন্নয়নে টিচিং অ্যাপ্রেন্টিস ফেলোশিপ

মোঃ আনোয়ার হাবিব কাজল

শিক্ষকতা শুধু একটি মহৎ পেশা নয়, বরং জীবন গঠনের পাথেয়ও বটে, তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপযুক্তরুপে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের বিশ্বের যাবতীয় পরিবর্তন সমূহের উপর সম্যক জ্ঞান রাখতে হয়। শিক্ষকতা অন্যান্য পেশার মত নয় বরং আলোকিত মানুষ গড়ার এটি এক স্বর্গীয় দায়িত্ব। একজন শিক্ষকই পারে সমাজের নানাবিধ চাহিদা পূরন ও অসঙ্গতি দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করতে এবং তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।

বিস্ময়কর হলেও সত্য যে পৃথিবীর বিখ্যাত মহামণিষী, নোবেল বিজয়ী, কবি-সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের অধিকাংশই জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। শিক্ষকতা পেশায় পৃথিবীর কোন কোন প্রখ্যাত মানুষ ছিলেন, জানেন ? একটু চোখ বুলাই সেই তালিকায়—সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল, বারাক ওবামা, সিলভেস্টার স্ট্যালন, হিলারি ক্লিনটন, বিল ক্লিনটন, ড. অমর্ত্য সেন, ড, ইউনুস এবং আরও অনেকে। এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, শিক্ষকতার গুরুত্ব এবং মহত্ব কতখানি। সেই আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত শিক্ষকতার কদর একটুও কমেনি, বরং প্রযুক্তির এই মহা-উত্থানের কালেও তা উত্তরোত্তর বাড়ছে। কিন্তু কেন?

প্রথমত, প্রতিটি মানুষই চায় তার নিজের জ্ঞানকে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে, বিলিয়ে দিতে। আর শিক্ষকতা হচ্ছে জ্ঞান বিলানোর সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি মানুষের মধ্যে রয়েছে এক অদম্য কৌতুহলী মন, যে শুধু জানতে চায় ও শিখতে চায়। সুতরাং জ্ঞানের রাজ্য আবিষ্কার করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে শিক্ষক হওয়া। শিক্ষকদের সব সময় জানা, শেখা, গবেষণা ও তথ্যের মধ্যে থাকতে হয়।

এছাড়াও শিক্ষকতার মধ্যে রয়েছে আরও বেশকিছু আকর্ষনীয় দিক। শিক্ষকরা সহজেই তারকা হতে পারেন, বিশেষ করে তাদের শিক্ষার্থীদের কাছে। যারা শিক্ষার্থীদের কাছে তারকা হোন, তারা আজীবন তারকাই থাকেন। শিক্ষকরা প্রতিদিন একঝাঁক তরুণ তাজা প্রাণের মুখোমুখি হতে পারেন। শিক্ষকতা পেশায় থাকলে নিজের পছন্দমতো কাজের পরিবেশ তৈরি করা যায়। শিক্ষকরা তার চারপাশের মানুষদের সহজেই অনুপ্রাণিত করতে পারেন। নিজের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চর্চা করতে পারেন শিক্ষকরা।

সুতরাং কেউ যদি শিক্ষক হতে চান তবে তার খুব ভালো একাডেমিক রেজাল্ট অবশ্যই থাকা চাই এবং সেই সঙ্গে একটি অনুসন্ধিৎসু মন, উদ্ভাবনী মেধা, জানা, শেখা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ এবং প্রযুক্তিবান্ধব হওয়া দরকার। আর এই সবকিছু ধীরে ধীরে উন্নতি করতে হয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিচিং অ্যপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রাম রয়েছে যার মাধ্যমে শিক্ষক হওয়ার গুণাবলী অর্জন করা যায়। দূর্ভাগ্য হলেও সত্য আমাদের দেশে এ ধরনের কোন নিয়ম বা প্রথা প্রচলিত নেই। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এমন একটি টিচিং অ্যাপ্রেন্টিস ফেলোশিপ প্রোগ্রাম চালু করেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষকতায় আগ্রহীরা আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগও পাচ্ছে।

একটা সময় ছিল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন ডিপার্টমেন্টের প্রথম শ্রেনীতে প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া শিক্ষার্থীই পরবর্তীতে ঐ বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন।তাতেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থেকে যেত। আর এখন সময় অনেকটা পাল্টেছে। শুধু ভাল ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব হারাচ্ছে। এখন শিক্ষকতা পেশায় আসতে হলে ভাল ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে অতিপ্রয়োজনীয় ও নিত্য ব্যবহার্য়্য তথ্যপ্রযুক্তি টুলস এর ব্যবহারিক জ্ঞানেও সমৃদ্ধ হতে হয়। অঅমি প্রায়শঃই দেখি এবং বিশ্বাস করি, প্রযুক্তির সাথে প্রজন্মের একটি নিবিঢ় সম্পর্ক রয়েছে। তাই একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষার্থীরাও প্রযুক্তি জ্ঞানে কোন অংশে পিছিয়ে নেই। সেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে শিক্ষককেও হতে হয় চৌকষ এবং তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব।

‘টিচিং অ্যাপ্রেন্টিস ফেলোশিপ প্রোগ্রামটি নেতৃত্ব উন্নয়ন ও শিক্ষকতার একটি পূর্ণকালীন চাকরি। এর মেয়াদ এক বছর। প্রোগ্রামটির মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, দক্ষ, প্রশিক্ষিত, টেকসই, আধুনিকমনষ্ক, প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষক তৈরি করা। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ছাড়াও দেশের যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পাশ করা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারীরা এই প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারবেন।

যা আছে টিচিং অ্যাপ্রেন্টিস ফেলোশিপ প্রোগ্রামে
এটি একটি এক বছর মেয়াদী শতভাগ বৃত্তিমূলক ফেলোশিপ। ফেলোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরিচালনা করবেন। নেতৃত্ব বিকাশে ফেলোদের জন্য রয়েছে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ফেলোশিপ শেষে ফেলোদের জন্য রয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ড্যাফোডিলের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খ-কালীন ও পূর্ণকালীন শিক্ষক হওয়ার সুযোগ।
আরও যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে ফেলোদের জন্য

এই প্রোগ্রামের আওতাধীন ফেলোরা প্রশিক্ষণকালীন সময়ে প্রথম মাসে দৈনিক ভাতা পাবেন। দ্বিতীয় মাস থেকে প্রশিক্ষণ শেষ হওয়া পর্যন্ত ফেলোরা তাদের দক্ষতার ভিত্তিতে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক বেতন পাবেন। এছাড়া ফেলোরা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিশ্বের যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম রয়েছে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন।

বাংলাদেশ একটি যুব জনশক্তির দেশ যেখানে বেশিরভাগের গড় বয়স সাড়ে সাতাশ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সমৃদ্ধ এই তরুণ যুব সম্প্রদায়কে যদি সত্যিকার অর্থে প্রশিক্ষিত হিসেবে তৈরি করা যায়, তবে তারাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখবে এবং একইভাবে অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করতে পারবে।

একজন শিক্ষার্থীর জীবনে শিক্ষকের ভ’মিকা খুবই গুরুত্বপূর্ন। তাই শিক্ষককেও হতে হবে পারদর্শী, তীক্ষ বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এবং ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে হতে হবে চৌকষ। আর এ বিষয়ুগুলোকে প্রফেশনালী হৃদয়ে ধারন করতে হলে টিচিং এপ্রেন্টিস ফেলোশিপ প্রোগ্রাম গুরুত্বপূর্ন ভমিকা পালন করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষক এবজন শিক্ষার্থীর জীবনে তার নীতি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, আদর্শ আর পান্ডিত্যের মাধ্যমে মেধা ও মননের বিকাশে আজীকন বেঁচে থাকেন।

আনোয়ার হাবিব কাজল

লেখকঃ মোঃ আনোয়ার হাবিব কাজল
ঊধ্বতন সহকারি পরিচালক (জনসংযোগ)
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

পছন্দের আরো পোস্ট