জগা বাবুর পাঠশালা থেকে আজকের জবি

মোঃ মঈনউদ্দীন।

একটি পাঠশালার বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠা শুধু দুঃসাধ্যই নয়, অবিশ্বাস্যও বটে। ঠিক এমনই অত্যাশ্চার্য ঘটনাটি ঘটেছে আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলাতে। বুড়িগঙ্গার ধারের জগা বাবুর পাঠশালা যে একদিন দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পরিণত হবে তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সদরঘাটে অবস্থিত একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্বতন জগন্নাথ কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। অধ্যাপক ড: এ. কে. এম. সিরাজুল ইসলাম খান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৮৫৮ সালে এবং ২০০৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ পাশ করার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে যাত্রা শুরু হয় ব্রাহ্ম স্কুল নামের একটি পাঠশালার। ব্রাহ্ম আন্দোলনের নেতা দীননাথ সেন, অনাথবন্ধু মৌলিক, পার্বতী চরণ রায়, ব্রজসুন্দর মিত্র প্রমুখের ঐকান্তিক চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় এই স্কুল।

উচ্চমানের পার্থিব শিক্ষার সঙ্গে ব্রাহ্ম ধমের্র মূল মতবাদ সম্পর্কে সাধারণ ছাত্রদের জানানোর জন্য আরমানিটোলায় ব্রাহ্ম সমাজের নিজস্ব প্রাঙ্গণে চালু করা হয় এই অবৈতনিক স্কুল। ব্রাহ্ম স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠাতা অনাথবন্ধু মৌলিক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারের তথ্যমতে ১৮৫৮ সালকে সঠিক হিসাবে ধরা হয়।

আর্থিক সঙ্কটের কারণে ১৮৭২ সালে মালিকানা পরিবর্তন করে ব্রাহ্ম স্কুলের ভার তুলে দেওয়া হয়েছিল বালিয়াদির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর হাতে। তখন জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী ব্রাহ্ম স্কুলের নাম পরিবর্তন করে তাঁর বাবা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে জগন্নাথ স্কুল নামকরণ করেন। এরপর থেকেই জগন্নাথ স্কুলের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৪ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ এবং ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজের মর্যাদা লাভ করে।

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ সময় স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অবনমন করা হয় জগন্নাথ কলেজকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সাজাতে নিজেদের গ্রন্থাগারের ৫০ ভাগ বই দান করে জগন্নাথ কলেজ। নিউমার্কেট এলাকায় জগন্নাথের সম্পত্তির ওপর নির্মিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল।

১৯৪৯ সালে এ কলেজে আবারও স্নাতক পাঠ্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান পুনরায় কো-এডুকেশন চালু করেন। এর আগে ১৯৪২ সালে কো-এডুকেশন চালু হলেও ১৯৪৮ সালে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

১৯৬৮ সালে পাক সামরিক বাহিনী জগন্নাথ কলেজকেন্দ্রিক স্বাধিকার আন্দোলনকে দমানোর জন্য জগন্নাথ কলেজকে সরকারিকরণ করে শুধুমাত্র বিজ্ঞান কলেজে রূপান্তরিত করে। এর বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগকে সরিয়ে মহাখালীতে নতুন জিন্নাহ কলেজ খোলা হয় (বর্তমান তিতুমীর কলেজ)।
১৯৭২ সালে জগন্নাথে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু হয়। সে সময় দেশের অন্য অনেক কলেজের মতো এই কলেজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষা কার্যক্রম চলতে থাকে।

জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে ২০০৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৮ম জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৫ সংসদে উত্থাপিত হয় এবং ২০ অক্টোবর একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট ছয়টি অনুষদে ৩৬ টি বিভাগ ও ২ টি ইনস্টিটিউট রয়েছে।

শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের জানান দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে জবির শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীরা। শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল বিভাগে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু রয়েছে। অনেক আগেই ইউজিসির প্রতিবেদনে এ-গ্রেডভুক্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। বিসিএসসহ সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ভর্তি পরীক্ষাতে গোপন বার-কোড পদ্ধতি চালু করার মাধমে জালিয়াতি রোধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

শূন্য আবাসনের বিশ্ববিদ্যালয়টি শীঘ্রই বাংলাবাজারে নির্মিত ‘বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল’-এর উদ্বোধন করে নারী শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গার সমস্যার সমাধান করতে যাচ্ছে। ‘বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল’ প্রকল্পের অধীনে ২০ তলা ফাউন্ডেশনের ওপর ১৬ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ শেষে দ্রুত এগিয়ে চলেছে ফিনিসিংয়ের কাজ। হলটি উদ্বোধন হলে এক হাজার ছাত্রীর আবাসন ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ঈধসঢ়ঁং ঘবঃড়িৎশ প্রকল্পের মাধ্যমে নেটওয়ার্কিং এ্যান্ড আইটি দপ্তরের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি বিভাগ এবং দফতরে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান করার জন্য ফাইবার অপটিক ক্যাবলের সাহায্যে একটি ব্যাকবোন নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। এতে ছাত্র-ছাত্রীরা ডরঋর এর মাধ্যমে তারবিহীন দ্রুত গতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেবাখাতের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবহন। পাঁচ বছর আগেও পরিবহনের জন্য সীমিতসংখ্যক যানবাহন ছিল; বর্তমানে ৫০টির মতো যানবাহন পরিবহন পুলে বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের অধিকতর পরিবহন সুবিধা দেয়ার জন্য বিআরটিসি থেকে ভাড়া করা বাসের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য নতুন ক্রয়কৃত ১০টি বাস বিভিন্ন রুটে চালু করার বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ক্যান্টিনটি সংস্কার করে আধুনিক ক্যাফেটিরিয়ায় রূপান্তর করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবা সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১০টি শাখার মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। উপরন্তু এখন এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক ডিজিটাল গ্রন্থাগার রূপে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। প্রায় ৬০টি ল্যাপটপের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের ই-বুকস ও অনলাইন জার্নাল সেবা চালু রয়েছে।

মর্যাদা ও ঐতিহ্যের কালো গাউন পরে সমাবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শেষ করার প্রত্যাশা থাকে সব শিক্ষার্থীরই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ হয় এবছরের শুরুতেই । প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পর ১১ জানুয়ারি ২০২০-এ প্রথম সমাবর্তন হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি)। পুরান ঢাকার ধূপখোলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে আয়োজিত হয় এই সমাবর্তন। সমাবর্তনে অংশ নেন প্রায় ১৮ হাজার গ্র্যাজুয়েট ও অন্য ডিগ্রিধারী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের কাজে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ৮৯৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা জমা দেয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের কাজ সরকারের বিভিন্ন দফতরের সমন্বয়ে দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে; যাতে করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন কার্যক্রম এগিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সকল সমস্যার সমাধান নতুন ক্যাম্পাসে গিয়েই সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

মোঃ মঈনউদ্দীন

লেখকঃ মোঃ মঈনউদ্দীন
প্রথম বর্ষ, আইন বিভাগ।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ছবিঃ আমেনা খাতুন

পছন্দের আরো পোস্ট