সালাতে রুকু ফরয এবং রুকুর গুরুত্ব

ডা. মুহাম্মাদ গোলাম মোস্তফা মূসা

সালাতের মধ্যে রুকু করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তে কমপক্ষে ৩২ রাকাত সালাত রয়েছে (১৭ রাকাত ফরয, ১২ রাকাত সুন্নাতে মুওয়াক্কাদা এবং ৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব)। এই ৩২ রাকাত সালাতে রয়েছে বান্দার জন্য ৩২ বার রুকু।
যে সব বান্দা অন্যান্য নফল সালাতে যত্নবান, তারা বেশী-বেশী রুকু করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। সালাতে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পাঠ করে ‘রুকু’ করার বিধান দেওয়া হয়েছে; সালাতে রুকু একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয।
*রুকু করার পদ্ধতি:* কোমর বাঁকা করে; মাথা নত করে; কোমর, পিঠ ও মাথা ভূমির সাথে সমান্তরাল সোজা করে, দু’হাতের তালু দিয়ে হাঁটুর উপর ভর করে রুকু করার পদ্ধতি স্থির করা হয়েছে।
সালাতের মধ্যে আল্লাহর সামনে ‘রুকু’ করে বান্দা এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করে, যেখানে বান্দা নিজেকে তার নাফসসহ তার শারীরিক, মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সকল স্বত্ব সমর্পণ করে এবং রুকুতে বান্দা তার রব্বের প্রতি অতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও বিনয় প্রকাশ করে।
*আভিধানিক অর্থে রুকু (رُكُوْعٌ):*
আরবী ভাষায় ‘রুকু’ শব্দটি একটি বিশেষ্যপদ; রাকা’য়া (رَكَعَ) এই ক্রিয়াপদ থেকে রুকু শব্দের উৎপত্তি। রাকা’য়া-ইয়ারকাউ (يَرْكَعُ – رَكَعَ) এই ক্রিয়াপদের অর্থ হলো দেহ বাঁকা করা; শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে দেহ ও মাথা নোয়ানো; মাথা নত করা; সালাতে মাথা নত করা বা রুকু করা; সমর্পণ করা, সারেন্ডার করা, ইত্যাদি।
রাকাহ (رَكَعَةٌ) বা রাকায়াত (رَكَعَات) অর্থ সালাতের রাকাত বা মাথানতকরণ। আল-কুরআনে চারটি শব্দরূপে মোট ১৩ বার বিভিন্ন অর্থে রুকু শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
*পারিভাষিক অর্থে রুকু (رُكُوْعٌ):*
*আল্লাহর বাণী-১: (وَإِذَا قِيْلَ لَهُمُ ارْكَعُوْا لَا يَرْكَعُوْنَ‏)* এবং যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘রুকু কর (রব্বের প্রতি নত হও), তারা রুকু করে না’ (৭৭:৪৮)।
*আল্লাহর বাণী-২: (يٰمَرْيَمُ اقْنُتِىْ لِرَبِّكِ وَاسْجُدِىْ وَارْكَعِىْ مَعَ الرّٰكِعِيْنَ‏ )* হে মারইয়াম, তোমার রব্বের জন্য অনুগত হও; আর সাজদা কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর (৩:৪৩)।
*আল্লাহর বাণী-৩: (يٰۤـاَيُّهَا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا ارۡكَعُوۡا وَاسۡجُدُوۡا وَ اعۡبُدُوۡا رَبَّكُمۡ وَافۡعَلُوۡا الۡخَيۡرَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ۩ ۚ‏)* হে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমরা রুকু কর, সাজদা কর, তোমরা তোমাদের রব্বের ইবাদত কর ও সৎকাজ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার (২২:৭৭)।
*আল্লাহর বাণী-৪: (وَإِذۡ بَوَّٱنَا لِاِبْرٰهِيْمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَنْ لَّا تُشْرِكْ بِىْ شَيْـئًـا وَّطَهِّرْ بَيْتِىَ لِلطَّآئِفِيْنَ وَالۡقَآئِمِيْنَ وَ الرُّكَّعِ السُّجُوْدِ‏)* আর স্মরণ কর, আমরা নির্ধারণ করেছিলাম ইবরাহীমের জন্য ঘরের (বায়তুল্লাহর) স্থান, (এবং বলেছিলাম) ‘আমার সাথে কোন কিছুকে শরিক করবে না’; আমার ঘরকে পবিত্র রাখবে তাওয়াফকারী, দাঁড়িয়ে সালাত আদায়কারী, রুকুকারী এবং সাজদাকারী জন্য (২২:২৬)।
*আল্লাহর বাণী-৫: (وَأَقِيْمُوْا الصَّلٰوةَ وَاٰتُوا الزَّكٰوةَ وَارْكَعُوْا مَعَ الرّٰكِعِيْنَ‏)* আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর (২:৪৩)।
*রুকুতে পঠিতব্য দোয়াসমূহ:* ইব্‌নে আব্বাস (রা.) এবং মালিক ইব্‌নে হুওয়ারিস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রুকুতে যাবার সময় পূর্ণভাবে ‘তাকবীর’ বলতে হবে’। নবী (সা.) রুকুতে পিঠ সোজা রাখতেন এবং ধীরস্থিরভাবে রুকু আদায় করতেন। যদি কেউ সঠিকভাবে রুকু না করে তবে তার সালাত হয়নি বলে বুখারীতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী, অনুচ্ছেদ:৫০৬ ও ৫১১ এবং হাদীস-৭৫৫, ইফাবা)।
*রুকুর তাসবীহ-১: (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْمِ)* “সুব্‌হানা রাব্বিয়াল আ’জীম”। অর্থ: আমার মহান-মহীয়ান রব্ব কত পবিত্র! How perfect my Supreme Rabb is! কমপক্ষে ৩ বার; তবে বান্দা তার সুবিধামত ৫, ৭, ৯, ১১ বার পড়তে পারে এবং অশেষ সাওয়াবের অধিকারী হতে পারে (তিরমিযী, হাদীস-২৬১, ইফাবা)।
*রুকুর তাসবীহ-২:(سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْمِ وَبِحَمْدِهِ)* “সুব্‌হানা রাব্বিয়াল আ’জীম ওয়াবি-হামদিহি”। [অর্থ: আমি আমার মহান-মহীয়ান রব্বের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করছি (সুনানু আবূ দাউদ, হাদীস-৮৭০, ইফাবা)।
*রুকুর তাসবীহ-৩: (سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْلِي)* “সুব্‌হানাকা আল্লাহুম্মা ওয়াবি-হামদিকা আল্লাহুম্মাগ-ফিরলী। হে আমাদের রব্ব আল্লাহ, আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং আপনার প্রশংসা করছি; হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন (বুখারী, হাদীস-৭৫৮, ইফাবা)”। বান্দা তার সুবিধামত ১, ৩, ৫, ৭, বার পড়বে এবং আল্লাহর পবিত্রতা, প্রশংসা করে নিজের জন্য ক্ষমা চাইবে”।
হে আল্লাহর বান্দাগণ আপনারা রুকুতে বেশী-বেশী করে ক্ষমা চান। আল্লাহ ক্ষমা করতে ভালবাসেন, আল্লাহই ক্ষমা করবেন, ইন-শা-আল্লাহ এবং আল্লাহর ক্ষমা থেকে কখনই নিরাশ হবেন না।
*রুকুর তাসবীহ-৪: (سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبَّنَا، رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ)* “সুব্বুহুন ক্বুদ্দুসুন রাব্বানা, রাব্বুল মালা-ইকাতি ওয়ার-রূহ। আমাদের, ফিরিশতাসকল ও রূহের রব্ব হচ্ছেন পাক, পবিত্র ও মহান (মুসলিম, হাদীস-৯৭৩, ইফাবা)”। বান্দা তার সুবিধামত ১, ৩, ৫, ৭, বার পড়বে এবং তার রব্বের পাক ও পবিত্রতা বর্ণনা করবে।
*রুকুর তাসবীহ-৫: (سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ، وَالْمَلَكُوتِ، وَالْكِبْرِيَاءِ، وَالْعَظَمَةِ)* “সুব্‌হানা যিল্‌ জাবারূতি, ওয়াল মালাকুতি, ওয়াল কিব্‌রিয়া-ই, ওয়াল আয্‌মাতি। হে প্রতাপ, রাজত্ব, অহংকার ও বড়ত্বের মালিক আল্লাহ, আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি (সুনানু আবূ দাউদ, হাদীস-৮৭৩, ইফাবা)”।
*রুকুর তাসবীহ-৬: (اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، خَشَعَ لَكَ سَمْعِي، وَبَصَرِي وَمُخِّي، وَعَظْمِي، وَعَصَبِي، وَمَا اسْتَقَلَّ بِهِ قَدَمِي)* “হে আল্লাহ, আমি তোমার উদ্দেশে রুকু করছি; আমি তোমার উপর ঈমান এনেছি; আমি মুসলিম হয়ে তোমার উদ্দেশ্য আত্মসমর্পণ করেছি। (হে আল্লাহ), তোমার জন্য সুনির্দিষ্ট করেছি আমার শ্রবণ, দর্শন, মস্তিষ্ক, হাড়, স্নায়ু-শিরা এবং পদযুগল যা কিছু বয়ে এনেছে (মুসলিম, হাদীস-১৬৮২, ইফাবা)”।
হে আল্লাহ, হে আমাদের মহান রব্ব, আমরা যেন সালাতে রুকুতে যথাযথভাবে প্রশংসা সহকারে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করতে পারি; হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে রুকুকারীদের সাথে কবুল কর, তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং নেক-সলিহীন ব্যক্তিদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাও। আমিন।
*রেফারেন্স:*
১. আল-কুরআনুল করীম” সম্পাদনা পরিষদ, বিয়াল্লিশ-তম মুদ্রণ, অক্টোবর ২০১০; ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।
২. ইমাম মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসমাঈল বুখারী (রাহি.), “বুখারী শরীফ”, ২য় খণ্ড, ৪র্থ সংস্করণ, জুন ২০০২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।
৩. ইমাম আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (রাহি.), “মুসলিম শরীফ”; ৩য় সংস্করণ, মে ২০০৪ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।
৪. ইমাম আবূ দাউদ (রাহি.), “আবূ দাউদ শরীফ”, সম্পাদনা পরিষদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় খণ্ড, ২য় সংস্করণ, আগস্ট ২০০৬।
৫. ইমাম আবূ ঈশা আত-তিরমিযী (রাহি.), “তিরমিযী শরীফ”, সম্পাদনা পরিষদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জুন ১৯৯৭।
*গ্রন্থনা ও সংকলন:*
ডা. মুহাম্মাদ গোলাম মোস্তফা মূসা
ইমেইল: <mostafa329@gmail.com>
পছন্দের আরো পোস্ট