কম্পিউটার ইন্টারনেট নেই গ্রামের অর্ধেক পরিবারে

লেখাপড়া ডেস্ক।

গ্রামের মানুষ এখনও ই-সেবা গ্রহণ ও ব্যবহারে পিছিয়ে আছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণার অভাব এবং ব্যবহার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকায় তারা শহুরে নাগরিকদের সঙ্গে সমান তালে চলতে পারছে না। গ্রাম ও শহরের এই ‘ডিজিটাল বিভাজনের’ কারণে ই-গভর্নমেন্ট প্রক্রিয়া পুরো দেশে সফলভাবে ছড়িয়ে পড়ছে না।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের ৯৬% পরিবারে মোবাইল ফোন থাকলেও তাদের অধিকাংশেরই (৫৯%) কোনো স্মার্টফোন নেই। এ ছাড়া, অর্ধেক পরিবারের কম্পিউটার (৪৯%) এবং ইন্টারনেট সংযোগ (৫৪%) নেই।

বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. ওয়াসেল বিন সাদাত গতকাল রোববার এক ওয়েবিনারে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন। আলোচনায় অংশ নেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, এটুআইর পলিসি অ্যাডভাইজার আনীর চৌধুরী, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির, সিজিএপির পলিসিপ্রধান গ্রেগরি চেন এবং বিআইজিডির রিসার্চ ফর পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (আরপিজি) বিভাগের প্রধান মেহনাজ রাব্বানী।

ওয়েবিনারে জানানো হয়, সম্প্রতি সারাদেশের ছয় হাজার ৫০০ গ্রামীণ পরিবারের ওপর এই সমীক্ষা করা হয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ডিজিটাল সাক্ষরতা কতটুকু, তা দেখা যায় ডিজিটাল সাক্ষরতা সূচকে (ডিএলআই)। ডিএলআই তৈরিতে এ ধরনের গবেষণা এবারই প্রথম করা হলো।

ডিজিটাল অ্যাক্সেস (ডিজিটাল সুবিধা পাওয়ার সক্ষমতা) হলো ডিজিটাল শিক্ষার দুটি মাত্রার একটি; অন্যটি ডিজিটাল স্কিল (দক্ষতা অর্জন) যেটি মানুষকে যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ এবং সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে। দেখা গেছে, সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ৬৮% এসএমএস পড়তে বা লিখতে পারে, ১০% ই-মেইল দেখতে ও পাঠাতে পারে, ১৫% ভিডিও কল করতে পারে, ৪১% সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারে এবং ২৮% সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত দিতে পারে। অন্যদিকে, ইন্টারনেট খুঁজে তথ্য পাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে ২৭% মানুষের এবং ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে জনসেবা সম্পর্কিত তথ্য বের করতে পারে ৫৯% মানুষ।

কিন্তু কোনো সমস্যা সমাধানের প্রশ্ন এলে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের এই ব্যাপারে দক্ষতা বেশ কম। যেমন, তাদের মধ্যে মাত্র ৩% মোবাইলের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করতে পারে, কম্পিউটার ব্যবহার করে কাজ করতে পারে মাত্র ৬%, ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিবিধ কাজ (যেমন সংবাদ পাঠ, অনলাইন প্রশিক্ষণ ইত্যাদি) করতে পারে ২০%, মাত্র ৩ শতাংশের আছে অনলাইনে কেনাকাটার অভিজ্ঞতা এবং ১ শতাংশেরও কম মানুষ অনলাইনের মাধ্যমে আয় করতে সক্ষম।

ডিজিটাল অ্যাক্সেসের মতোই এই পরিবারগুলোকে ডিজিটাল স্কিলের ওপর ভিত্তি করে চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ গ্রামীণ পরিবারের দক্ষতা ‘কম’, ১৬% এর দক্ষতা ‘শূন্য’, ১৫% পরিবারের ‘নূ্যনতম’ দক্ষতা আছে এবং ৮% পরিবারের দক্ষতা ‘নূ্যনতমের ওপরে’।

এই গবেষণায় দুটি মাত্রার মাধ্যমে ডিএলআইয়ের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে- ডিজিটাল অ্যাক্সেস এবং ডিজিটাল স্কিল। গবেষণা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং খুলনা বিভাগের পরিবারগুলোতে ডিজিটাল অ্যাক্সেস, ডিজিটাল স্কিল এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার হার বেশি। অন্যদিকে ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগে এই হার বেশ কম। এ ছাড়া ডিজিটাল অ্যাক্সেসের সঙ্গে ডিজিটাল স্কিলের ইতিবাচক সম্পর্ক থাকলেও দেখা গেছে, পরিবারের উপার্জন ওই পরিবারের ডিজিটাল সাক্ষরতা, দক্ষতা ও সক্ষমতার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পরিবারের আয়তন ডিজিটাল অ্যাক্সেসের ওপরে বড় প্রভাব রাখলেও ডিজিটাল দক্ষতার ওপরে তেমন প্রভাব ফেলে না।

অন্যদিকে, পরিবারপ্রধানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ডিজিটাল অ্যাক্সেস, ডিজিটাল স্কিল ও সাক্ষরতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পরিবারপ্রধানের লৈঙ্গিক পরিচয় ডিজিটাল অ্যাক্সেসে খুব একটা প্রভাব না ফেললেও দেখা গেছে, নারীপ্রধান পরিবারে ডিজিটাল সাক্ষরতার হার বেশ ভালো।

ওয়েবিনারে বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন বলেন, ‘গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআইজিডিতে আমরা ডিজিটাইজেশনের একটি পুরো সামাজিক বিজ্ঞান তৈরি করতে চাই, যেটি আসছে বছরগুলোতে খুবই অর্থবহ হবে। এই জরিপটি ডিজিটাল সামাজিক বিজ্ঞানের একটি অংশ।’

মেহনাজ রাব্বানী বলেন, ‘ই-গভর্নমেন্ট পদ্ধতি প্রণয়ন করার জন্য আমাদের প্রয়োজন বেশ বড়সড় একটি জনগোষ্ঠী, যারা ডিজিটাল শিক্ষায় শিক্ষিত। এই শিক্ষা শুধু ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারে প্রতিফলিত হবে না, তাদের আচরণেও প্রতিফলিত হবে।’

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, ‘যখন চাহিদা বাড়ে, তখন জনগণের মাঝে পরিবর্তনের আগ্রহও বৃদ্ধি পায়। ই-সেবাগুলোর চাহিদা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, এই চাহিদা ডিজিটাল লিটারেসির ক্ষেত্রেও বাড়ছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল লিটারেসি অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো।’

সূত্র: সমকাল।

পছন্দের আরো পোস্ট