করোনা পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা কি আসলেই বদলে যাবে?

এহতেশামুল হক

২০১৯ এর ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে প্রথম প্রকাশ পেয়ে কোরোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) এর দ্রুত বিস্তারের ফলে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) ১১ ই মার্চ ২০২০ এটিকে একটি বিশ্ব মহামারী হিসেবে ঘোষণা করে এ সংস্থার ইমারজেন্সি কমিটি বিশ্বের প্রতি সতর্কতা জারি করে। বর্তমান লিবারেল বিশ্ব ব্যবস্থায় বিশ্ব প্রশাসনের ভূমিকা পালনকারী জাতিসংঘ এ মহামারীতে কার্যকর কোন ভুমিকা রাখতে পারেনি । ফলে রাষ্ট্রসমূহ তাদের নিজস্ব পদক্ষেপ নিতে উদ্যত হয়েছে। এটি পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্ব সমস্যা সমাধানের জন্য গড়ে উঠা “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়” (ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি) এর ধারণাটিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে মহামারীটি মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘকে দ্রুত আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রসমুহকে প্রস্তুত করে এ রোগের চিকিৎসার জন্য ভ্যাকসিন এবং ওষুধ আবিষ্কারের জন্য গবেষণাকে উৎসাহিত করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়। জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডব্লিউএইচও-মানব সুরক্ষায় ক্রমবর্ধমান বিপদের কথা উল্লেখ করে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করলেও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার কোন লক্ষণ দেখা যায়নি।

জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্টনি গুতেরেস করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত এজেন্ডা নিয়ে জরুরি বৈঠকে এ সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা- নিরাপত্তা পরিষদকে ডাকেনি। বরং, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণে করেই সন্তুষ্ট থাকে। ডব্লিউএইচও ‘র সবচে প্রভাবশালী দুটি সদস্য- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন এর মধ্যে করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডব্লিউএইচও’র বিরুদ্ধে চীনের অনুকূলে কাজ করার অভিযোগ এবং এই সংস্থার জন্য আর্থিক সহায়তা হ্রাস করার ঘোষণা বিদ্যমান সংকটকালীন পরিবেশে ডব্লিউএইচওর রাজনৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি দুর্বল করে দিয়েছে। আসলে ডব্লিউএইচও’র এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান বৈশ্বিক শাসন সঙ্কটের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা এবং সামর্থ্য নিয়ে বিতর্ক শুধুমাত্র জাতিসংঘ কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক অনেক সহযোগিতা সংস্থার ব্যর্থতা এবং অকার্যকরতা নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ,একটি সুপ্রে-ন্যাশনাল সংগঠন হিসেবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও বর্তমান মহামারী সংকটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমন্বিত সহযোগিতা পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেনি; বরং দ্বিপাক্ষিক অর্থাৎ আন্ত-রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একে অন্যকে সহযোগিতা করছে। দক্ষিণ-ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহ (ইতালি, স্পেন এবং ফ্রান্স) ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর তাদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি আরোপ শুরু করে এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশ সমূহের মধ্যে ভিসামুক্ত যাতায়াতের জন্য বিদ্যমান শেঙ্ঘেন চুক্তিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে,৯ ই এপ্রিল ২০২০ জার্মানী-ইতালী কর্তৃক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশসমুহকে তাদের মধ্যকার পুরাতন বিভাজনকে ভুলে গিয়ে “ইউরোপীয় সংহতি”র ভিত্তিতে কাজ করার আহবান তাদের নিজেদের মধ্যকার বিদ্যমান সমস্যাকে সামনে এনেছে। সংকটকালীন সময়ে ব্রাসেলস ভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যর্থতা এসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থহীন করে তুলেছে। চীন এবং তুরস্কের মত রাষ্ট্রের ইতালি ও স্পেনের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে চিকিৎসা সাহায্য পাঠানোর ফলে এসব দেশের জনগণের সামনে সেদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার চিত্র ভালভাবে ফুটে উঠেছে যা ইউরোপের অনেক দেশে বিচ্ছিন্নতাকামী (উগ্র-জাতীয়তাবাদী) আন্দোলনকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে।

একইভাবে,২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা জি- ২০ ও আজ কার্যকর কোন ভুমিকা রাখতে পারছেনা। করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর মার্চের শেষ সপ্তাহে টেলিকনফারেন্সে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্ব অর্থনীতির আসন্ন ধ্বস ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সংহতির উপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও চোখে পড়ার মত কোন কার্যকরী সিদ্ধান্তে পোঁছাতে পারেনি তারা।

সামরিক জোট ন্যাটোর পক্ষে করোনা মহামারী মোকাবিলায় কোন ভূমিকা রাখা সম্ভব নয় । একটি ক্লাসিক প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে ১১ ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে ন্যাটো তাদের কৌশলপত্রে সন্ত্রাসবাদকেই বিশ্ব নিরাপত্তার প্রধান হুমকি উল্লখ করে এর বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে। ২০১৪ সালে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণা পত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব ব্যাপী স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করলেও ছিলনা মহামারী রোগের বিরুদ্ধে লড়াই এ তাদের কি ভূমিকা হতে পারে তার কোন নির্দেশনা। জার্মানি,ফ্রান্স,ইতালি এবং স্পেনের মতো দেশগুলিতে করোনার তীব্র আক্রমনের কারণে “ইউরোপীয় ডিফেন্স ২০২০ ” নামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ন্যাটোর ২৫ বছরের বৃহত্তম সামরিক মহড়া পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে গেছে। বরং ন্যাটোর ইউরো-আটলান্টিক জরুরী সহায়তা সমন্বয় কেন্দ্র মিত্রদের মধ্যে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্ভবত,করোনা পরবর্তী ন্যাটোর প্রথম শীর্ষ বৈঠকে মহামারী রোগের বিরুদ্ধে লড়াই জোটের কৌশলগত এজেন্ডাতে অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে,যে সংস্থাটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং যার অবিশ্বাস্য সামরিক অবকাঠামো রয়েছে এই সংকট কালে তা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে কারন এতে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে যার মধ্যে একটি বড় সংখ্যায় রয়েছে ন্যাটোভুক্ত দেশের নাগরিক। ফলে এসব দেশের সাধারণ জনগণ এ সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছে।

আজ, রাজনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম বারবার বলছে যে করোনা পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটবে এবং বিশ্ব ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী সংগঠনসমূহ পুনর্গঠিত হবে। আসলে,কতটা পরিবর্তন আসবে? গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে জাতিসংঘ’র নেতৃত্বাধীন “লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার” কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সঙ্কট,স্নায়ু যুদ্ধের সমাপ্তি এবং তৎপরবর্তী অস্থিরতা ,৯/১১ ঘটনা এবং বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের মতো বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলেও, বিগত সত্তর বছর যাবত জাতি সঙ্ঘের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের মূল কাঠামো এবং কার্যক্রমের বড় অংশ ধরে রাখতে সম্ভবপর হয়েছে । যাইহোক,বিশ্বের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া প্রতিটি তিক্ত মুহূর্ত বিশ্ব ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সৃষ্টি করে কিছু পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে বিশ্ব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনার পথ দেখিয়ে গেছে।

গত এক দশক ধরে বিশ্ব ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে যে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা হচ্ছে তা জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির দিকে তীর ছুঁড়েছে কারন এটি বিশ্ব ব্যবস্থায় নতুন শক্তির সম্পর্ক (পাওয়ার রিলেশন) নিয়ে ধারনা দিতে পারছেনা। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং বৈশ্বিক সংকট সমাধানে অকার্যকর বলে সমালোচনা চলছিল। তবে ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে জাতিসংঘের পুনর্গঠনের জন্য দাবীগুলি দুর্ভাগ্যক্রমে মোড়ল রাষ্ট্রসমূহ তাদের অবস্থান ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয়ে অগ্রাহ্য করে গিয়েছে। স্থায়ী পরিষদের পাঁচটি সদস্য রাষ্ট্রের বর্তমান মনোভাবের দিকে তাকালে একথা অন্তত বুঝা যায় যে, করোনা মহামারী বিদ্যমান লিবারেল বিশ্ব ব্যবস্থায় আমূল কোন পরিবর্তন আনবে না। যুক্তরাষ্ট্র,ব্রিটেন,ফ্রান্স,রাশিয়া এবং চীন বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার পক্ষে থাকবে যেহেতু এ রাষ্ট্রগুলো লিবারেল বিশ্ব ব্যবস্থায় আন্তঃনির্ভরতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের শক্তি ও অবস্থানকে সংহত করে সবচে বেশী লাভবান হয়েছে। বিশেষত রাশিয়া এবং চীন স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তারা লিবারেল বিশ্ব ব্যবস্থা থেকে সেটা পুষিয়ে নিয়ে দারুন লাভবান হয়েছে। জি -২০-তে ইউএনএসসির পাঁচটি স্থায়ী সদস্যও রয়েছে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ৮০ শতাংশ জি-২০ দেশসমূহের দখলে রয়েছে।

তবে এটা ঠিক যে, জাতিসংঘের ব্যবস্থায় কোন আমূল পরিবর্তন না হলেও,আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর ব্যাপারে রাষ্ট্রসমূহের দৃষ্টিভঙ্গির আংশিক পরিবর্তন অনিবার্য হবে। কারন করোনা ভাইরাসটির প্রথম প্রাদুর্ভাব এবং পরবর্তীতে মহামারী আকার ধারন করে বৈশ্বিক হুমকিতে পরিণত হওয়া-এই পুরো সময়ে জাতিসংঘের কার্যত কোন ভূমিকা দেখা যাচ্ছেনা। জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ সংস্থা ডব্লিউএইচও পরিস্থিতি বোঝার,ব্যাখ্যা করার, মোকাবিলা করার জন্য সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে একত্রিত করে সমন্বিত কোন পদক্ষেপ নিতে অনেক দেরি করে ফেলেছে ফলে রাষ্ট্রসমূহ নিজেরাই নিজেদের মত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যত হয়েছে। রাষ্ট্রসমূহ এখন ‘সেলফ হেলফ’ (স্ব-সহায়তা) তত্ত্বের দিকে ঝুঁকছে এবং তাদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া শুরু করেছে। ফলে সহযোগিতার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের ধারণার উপর যে “আন্তর্জাতিক সমাজ” বিদ্যমান আছে তার প্রতি রাষ্ট্রসমূহের দৃষ্টিভঙ্গির যে পরিবর্তন হতে যাচ্ছে তা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তবে কার দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বদলাবে তা নির্ভর করছে তার ভেতরকার আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা ও বিদেশ নির্ভরতার মাত্রার উপর।

লেখকঃ এহতেশামুল হক, পিএইচডি গবেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, আঙ্কারা ইলদিরিম বেয়াজিত বিশ্ববিদ্যালয়।

পছন্দের আরো পোস্ট