ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের সেবায় এক মাদরাসা শিক্ষার্থী

লেখাপড়া ডেস্ক।

করোনাভাইরাস মারণ থাবা বসিয়েছে বাংলাদেশে। প্রতিদিনই শত শত রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন। মারাও যাচ্ছেন অসংখ্য রোগী। মহামারির এই দুঃসময়ে করোনারোগীদের সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। করোনা আক্রান্ত বাবা-মার মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে সন্তান, মরদেহ সৎকারে এগিয়ে আসছে না পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনও। করোনার চিকিৎসা দেওয়া স্বাস্থ্যকর্মীরাও সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে এমন এক সংকটে ঘরে বসে থাকেননি কওমি মাদরাসার ছাত্র জুনায়েদ আহসান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের সেবায় মাঠে নেমেছেন তিনি।

জুনায়েদ আহসানের ডাক নাম জুনু। রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে কচুক্ষেত বাজারের উল্টো পাশে বসবাস করা ডাক্তার মো. হাকিম শাহাব উদ্দিন এবং মোছা. সালমা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। মানুষের সেবার জন্য তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বিডি আর্তসেবা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

জানা যায়, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে প্রায় মাসব্যাপী একটানা দিন-রাতে করোনা রোগীদের সেবা করে যাচ্ছেন। এ কাজে তার সাথে দেলোয়ার খান নামে আরো একজন স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। দুই জন পালাক্রমে কাজ করেন। একজন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা, আরেকজন জন রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। প্রতিদিন গড়ে তারা ৭-৮টি মরদেহ মর্গে নিতে সহায়তা করেন। এছাড়া রোগীদের অক্সিজেন লাগানো, গরম পানি, খাবার-ফলমূল এনে দেওয়াসহ বিভিন্ন সেবা করেন তারা।

কওমি মাদরাসার ছাত্র জুনায়েদ আহসান বলেন, আমাদের একজন স্বেচ্ছাসেবক বন্ধু শেখ ঈশান করোনা আক্রান্ত হয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার কাছে আমি প্রায় আসতাম। তার কাছে একদিন জানতে চাইলাম আচ্ছা আমরা শুনি হাসপাতালে রোগীদের জন্য অক্সিজেন নেই, চিকিৎসা ঠিকমত পায় না, সঠিক বাস্তবতা কী? তখন সে আমাকে বলে, অক্সিজেন অনেক আছে। কিন্তু সেগুলো গেটের সামনে থাকে। অক্সিজেনের দরকার হলে নিজেরটা নিজেই এনে লাগাতে হয়। বয়স্ক ও বেশি অসুস্থ ব্যক্তিদের নিজেই অক্সিজেন নিয়ে এসে লাগানো সম্ভব না। আমি তাকে আরো জিজ্ঞেস করি আর কী কী সমস্যা? তখন সে বলে যেখানে নিজের পরিবার দূরে ঠেলে দিচ্ছে, সেখানে ডাক্তার, নার্স এবং ওয়ার্ডবয়রা কতটা ভালবাসা দেখাবে! সেই কারণে করোনা রোগীরা সঠিক সময়ে সঠিক সেবা পায় না। তখন আমি তাকে হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার কথা বলি। তখন সে আমাকে বারণ করে। এরপর একদিন সে আমাকে কল দেয়, আমি গিয়ে দেখি সে চরম অসুস্থ। বমি করছে বারবার। তার হাসপাতালের বেডের দুই পাশেই দুজন করোনা আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন। এভাবেই আমার সেই বন্ধু ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা দুইপাশে দুটি মরদেহের মাঝখানে শুয়ে ছিল। ভয়ে সে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ে।

জুনায়েদ আহসান বলেন, তখন আমি ভাবলাম পরিস্থিতি যতটা ভয়ংকর হোক, মৃত্যু ঝুঁকি থাকলেও কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতেই হবে। আমি যেহেতু কওমি মাদরাসার ছাত্র তাই আমার বিশ্বাস পৃথিবী উল্টে গেলেও আমার মৃত্যু যখন, যেখানে এবং যেভাবে লেখা আছে, সেভাবেই হবে। তাহলে আমি কেন এই রোগীদের সেবা দিচ্ছি না? বাবা-মাকে বললাম, তারা কিছুতেই রাজি না। অনেক বোঝানোর পর বাবা-মা একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে যখন দেখলো আমাকে কিছুতেই থামাতে পারছে না, তখন তারা বলে, তুমি যখন যেতেই চাও, তাহলে আর কি করা যাও, তবে সাবধানে থেকো।

এরপর তিনি কুর্মিটোলা হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে মরদেহ ৭/৮ ঘণ্টা বেডে পড়ে থাকে। সেটা যেন না হয়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই লাশটাকে বেড থেকে সরিয়ে নিতে চান তিনি। করোনা টাকা পায়সা ছাড়ই এই কাজ করতে চান বলে জানান কুর্মিটোলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। তিনি বলেন, আমি যেহেতু করোনা আক্রান্ত ও মারা যাওয়া রোগীদের নিয়ে কাজ করবো, ফলে আমার বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না, তাই আমাকে শুধু হাসপাতালে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তখন আমার কথায় রাজি হয়ে যায়। এভাবেই আমি এ কাজের সাথে যুক্ত হই। এখনো আমি লাশ দ্রুত মর্গে বা ফ্রিজে নেওয়ার ব্যবস্থা করি।

তিনি করোনা রোগীদেরও বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে প্রতিদিন রাত ১২টায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে দেখেন নতুন রোগী যারা আসছে, তাদের কারও কিছু লাগবে কি-না, কারো অক্সিজেন লাগবে কি-না, নতুন কোনো রোগী এলে সে যদি বয়স্ক হয়, তার সাথে যদি কোনো লোক না থাকে তার মোবাইলে তার নাম্বারটা সেভ করে দেন তিনি এবং বলেন যত রাতই হোক যে কোনো প্রয়োজনে তাকে কল দিতে। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিন রাতেই আমাকে কেউ না কেউ কল করে বলে তার অক্সিজেন শেষ, তখন আমি দ্রুত তার অক্সিজেন লাগিয়ে দেই। কারও গরম পানি লাগলে এনে দেই। অনেকের কাছে টাকা থাকে কিন্তু ফলমূল আনার লোক নাই। তাদের ফলমূল এনে দেই। যার যখন যেটা প্রয়োজন আমার সাধ্যের মধ্যে থাকা সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করি।

এই কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থী সবার উদ্দেশে বলেন, যারা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের আমরা যেন অবহেলা না করি। এটা একটা রোগ। এই রোগ যে কারো হতে পারে। যে আক্রান্ত হয়ে গেছেন তাকে আমরা যেন সেবা যত্ন দিয়ে ভালো করে তুলি। কারণ সে ভালো হয়ে ওঠলে তার দেওয়া প্লাজমা থেকে আপনার পরিবারের কেউ ভালো হয়ে ওঠতে পারে।

মাদরাসা শিক্ষার্থী জোনায়েদ আহসান স্বপ্ন দেখেন একদিন হাসপাতালের বেড থেকে তাকে একটা লাশও নামাতে হবে না। হয়তো একদিন কোনো করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর খবর পাবে না। হাসপাতালে থাকবে না একজনও করোনা রোগী। সেদিন নিজের এই স্বেচ্ছাশ্রম থেকে মুক্তি নিয়ে ফিরে যাবেন নিজ বাড়িতে বাবা-মার কোলে।

করোনা মুক্ত হউক সারা বিশ্ব এটা সবারই চাওয়া। তবে জোনায়েদের চাওয়াতে যেন অন্যরকম এক মাহাত্ম্য আছে। কারণ জোনায়েদের মতো আর সবাই স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন না। করোনা রোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা দিচ্ছেন না। শুধু আশা করছেন, হয়তো কোনোদিন শুনব দেশে আর কোনো করোনা রোগী পাওয়া যায়নি।

পছন্দের আরো পোস্ট