করোনা ভাইরাস ও পানি 

প্রফেসর ডা: হাসিনা বানু

বর্তমান বিশ্বে করোনা ভাইরাস এর আক্রমন হতে প্রতিরোধ করার জন্য প্রতিটি মানুষকে ২০ সেকেন্ড ধরে ভালভাবে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, যে হাত আমরা দিনে ৪-৫ বার পরিস্কার করতাম এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে না। এই সময়ে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে গোটা বিশ্বের মানুষের মধ্যে নেমে এসেছে একটি ভয়ংকর পরিনতি। করোনা ভাইরাস যে শুধুমাত্র মারাত্মক জীবন হত্যাকারী ভাইরাস তা নয় এর সঙ্গে সঙ্গে হচ্ছে খাদ্যের বিপর্যয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং ঔষধ এবং পানির বিপর্যয়। প্রতিবছর গরমকালে দেখা যায় পানির চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের মাত্রা বেশ কম। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে “বিশেষ প্রয়োজন ব্যতিত বাসার বাইরে কেউ বের হবেন না। ভালভাবে (কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড) সাবান দিয়ে বারবার হাত ধুতে হবে (কাপড় কাঁচার সাবান বেশি উত্তম)। হাত ধোয়ার সময় যাতে পানির অপচয় না হয়, সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে।”

ঢাকা মহানগর ও এর আশপাশের এলাকার জন্য প্রত্যক দিন প্রতি মানুষের জন্য মাথাপিছু ১৫০লিটার পানির প্রয়োজন সমস্ত বিশ্ব জুড়েই উন্নত এবং সল্প উন্নত দেশগুলোতে পানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দিন দিন পানির চাহিদা বাড়ছে। আমরা শুধুমাত্র যদি দক্ষিন আফ্রিকার কেপ টাউনের দিকে লক্ষ্য করি তবে এর ভয়াবহতা বুঝতে পারবো। দক্ষিন আফ্রিকার কিছু কিছু জায়গায় সারাদিনের জন্য তাদের কলের লাইন বন্ধ করে দেয়া হয় এবং সেখানে সারাদিনেও পানির সাপ্লাই পাওয়া যায় না। সে সময় সে এলাকার অধিবাসীরা রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে জনপ্রতি ২৫লিটার পানি প্রতি দিনের জন্য সংগ্রহ করতে পারে। নিটির সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতের ২১টি শহর যেমনঃ দিল্লী, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই ও হায়দ্রাবাদে ভুগর্ভস্থ পানির স্বল্পতা ২০২০ সালেই দেখা দিবে যার ফলে ১০কোটি মানুষ পানির অভাব অনুভব করবে এবং সমগ্র ভারতের জনসংখ্যার ৪০ভাগ লোকেরই খাবার পানির সরবরাহে সাংঘাতিক রকমের স্বল্পতা দেখা দিবে। ২০৩০ সাল নাগাদ সমগ্র ভারতের ৪০% লোকেরই খাবার পানির অভাব হবে। পৃথিবীর অন্যান্য বড় বড় শহরেও পানির চাহিদা অনুযায়ী অস্বাভাবিক ভাবে এর পুজি (Resource) কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ঢাকা একটি বড় শহর এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে দেখা গেছে। এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৪৪ হাজার ৫০০ প্রতি বর্গ কিলোমিটার। ঢাকার কাঠামোগত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৬-২০৩৫ সালের মধ্যই এর জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২২.৭৯ কোটি। এত মানুষের পানির চাহিদা মিটানো সত্যি একটি বিশাল মোকাবিলার সম্মুখিন হওয়া বোঝায়। ওয়াসার সমীক্ষা অনুযায়ী প্রতিদিন একজন মানুষের পানির চাহিদা ১৫০ লিটার। কিন্তু ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সমীক্ষা অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের প্রতিদিন বিভিন্ন রকমের বিভিন্ন ভাবে পানি ব্যবহার করার পরিমান ৩১০ লিটার। দেখা যাচ্ছে সেটি ওয়াসা কর্তৃক যা ধারনা দেখানো হয়েছে তার দ্বিগুণ। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে লোকজন তাদের ঘরবাড়ির কাজের জন্য কমপক্ষে নূন্যতম ৮৫লিটার পানি ব্যবহার করে। কিন্তু ধনী মানুষ অধিস্টিত এলাকা যেমনঃ গুলশান, বনানী, বারিধারার মত জায়গায় প্রতিটি মানুষ প্রায় ৫০৯ লিটার পর্যন্ত পানি খরচ করে। আমাদের দেশে যেভাবে নদী নালার পানি স্বল্পতা দেখা দিয়েছে, কোন কোন জায়গায় পানির অভাবে চর ভেসে উঠেছে, এই নদী নালা,খাল গুলো আইন বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে জলাভূমিগুলো বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে, যার ফলে চাহিদা অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি তুলে ব্যবহার করার জন্য সেখানে পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে এবং পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গিয়েছে যা আমরা শীত এবং গ্রীষ্ম কালে দেখতে পারি। ঢাকা শহরের ৭৮% পানি সরবরাহ করে ওয়াসা এবং এই পানির চাহিদা মিটাতে গিয়ে ওয়াসা ভূগর্বস্থ পানি তুলে এনে সরবরাহ করে এবং বলা হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে ভূগর্বস্থ পানির স্তর ৬.৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত কমে যাবে।

আমি পানি নিয়েই কথা বলতে চাচ্ছি এই জন্য যে, আমাদের দেশে মানুষের দৈনন্দিন খরচের মধ্যে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই সেটি অর্থনৈতিক হোক অথবা পানির দিক থেকেই হোক। এই সময়ে আমাদের পানির ব্যবহারে কৃচ্ছতা সাধন করতে হবে যেমনঃ আমাদের ঘর সংসারের জন্য যে পানি ব্যবহার, হাত মুখ ধোয়া, গোসল করা ও অন্যন্য ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে।

কিভাবে কমিয়ে আনতে পারি!!

১) ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি যে পাইপের মাধ্যমে এসে আমাদের কল দ্বারা সরবরাহ করে সেই কলের কন্ট্রোলিং নব যদি আমরা পুরো খুলে না রেখে ৪ ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করি তবে আমাদের পানির খরচের মাত্রা অনেক কমে যাবে।

২) এখন যেহেতু আমরা বেশি বেশি হাত ধোয়ার কথা বলছি সেক্ষেত্রে যদি আমরা ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়ার সময় কলের নবটি বন্ধ রেখে হাত পরিস্কার করে আবার নবটি খুলে হাত ধুয়ে ফেলি তবে পানির সাশ্রয় হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রযোজ্য কথা হচ্ছে আপনি যখন সাবান দিয়ে হাত ধুবেন তখন কলের নবটিও আপনারা সাবান দিয়ে ঘষে নিবেন এবং হাত ধোয়ার সময় নবের লেগে থাকা সাবানটুকু ধুয়ে ফেলবেন তা না হলে নবে লেগে থাকা ভাইরাসটি হাতে লেগে যাবে এবং সেই ভাইরাসযুক্ত হাতটি শরীরে আক্রান্ত করতে পারে।

৩) যখন হাত-মুখ অথবা অযু করি তখন কল খুলে রেখে কাজ সম্পন্ন করি। সেই সময় কলের নিচে যদি একটি মগ দিয়ে রাখি তবে বাকি পানি গুলো অপচয় না হয়ে আমরা বাকি কাজগুলো সেরে ফেলতে পারছি এতে ব্যাপক ভাবে পানি সাশ্রয় হবে।

৪) যারা বিত্তবান ব্যক্তি আছে এবং যারা বাড়ীতে গোসলের জন্য বাথটাব অথবা যাকুজি ব্যবহার করেন তারা যদি গোসলের সময় এটি বন্ধ করে এক বালতি পানি ভরে নিয়ে সেই পানি দিয়ে গোসল করেন তাতে হয়তো ১-১.৫ বালতি পানি দিয়েই গোসল সম্পন্ন করা যাবে অথবা আমরা যারা বাথরুমে ঝরনায় গোসল করার সময় কল খুলে রেখেই গোসল করি তবে সেখানে অনেক পানি খরচ হবে। যদি আমরা বালতির পানি দিয়ে গোসল করি তবে পানির ব্যবহারে বড় ধরনের কৃচ্ছতা সাধন হবে।
এছাড়া যেখানে সুইমিং পুলের ব্যবস্থা আছে সেগুলো বন্ধ রাখতে পারলেও পানির খরচ অনেকটা কমে যাবে এবং এতে আমরা সাধারন মানুষেরা পানির সরবরাহ থেকে কিছুটা নিশ্চিন্ত হবো।

৫) আমরা যখন পানি খাওয়ার কথা চিন্তা করি তখন পুরো এক গ্লাস পানি ঢেলে নেই। বেশিরভাগ সময় অর্ধেক পানিও খাইনা, এতে বাকি পানি গুলো ফেলে দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না এতে পানির অপব্যয় হয়।
৬) গাছ প্রেমিকেরা পাইপের মাধ্যমে পানি না দিয়ে বালতিতে করে পানি দিলে পানির অনেক অপচয় রোধ করা সম্ভব।

একটি কথা বলে রাখা ভালো যদি সম্ভব হয়, কৃষিবিদরা এক ধরনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন যেখানে একটি বড় ড্রামের মধ্যে পানি রেখে সেখান থেকে বিভিন্ন নলের সাহায্যে একসাথে কয়েকটি গাছে একসাথে পানি দেয়া যায় এবং এতে পানির খরচ অনেকটা কম হয়।

এখন গ্রীস্মকালেও বৃষ্টি হচ্ছে এবং এই সময় আমরা বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্রের মাধ্যমে সংরক্ষনের দ্বারাও ওয়াসার পানির চাহিদা কিছুটা কমিয়ে আনতে পারি।তবে বর্তমান এই ক্রাইসিস এর সময় আমাদের চিন্তা করতে হবে আমরা কিভাবে নিত্য ব্যবহৃত পানির পরিমান কমিয়ে আনতে পারি।

প্রফেসর ডা: হাসিনা বানু,হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ

পছন্দের আরো পোস্ট