মলদোভা এয়ারপোর্টে যেতে

আরিফুর রহমান।

মলদোভা এয়ারপোর্টে যেতে বাম দিকে টার্ন নিতেই ট্রাফিক পুলিশের ইশারা– গাড়ি থামাও। বাংলাদেশি বন্ধু ড্রাইভারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এই মোড় থেকে বাম দিকে টার্ন নেয়া নিষিদ্ধ, তাড়াহুড়োয় তিনি সেই ভুলটি করে ফেলেছেন।

গাড়ীর কাঁচ নামিয়েই পুলিশের কাছে বন্ধুটির সবিনয় কৈফিয়ত, এরা সবাই বিদেশী ভিআইপি, প্লেন লেট হয়ে যাচ্ছে, ভুলটি মাফ করে দেন পুলিশ অফিসার, প্রফাবর (প্লিজ)।

পুলিশটি বলে, ইটালিয়ান বলছেন কেন? রোমানিয়ান বা মলদোভার ভাষা জানেননা? সমস্যা নাই, ভাষা সবগুলিই বুঝি আমি, ড্রাইভিং লাইসেন্স আর গাড়ির কাগজ দেন।

বাঙালী ভাইর জবাব,— অফিসার আমার চশমা নেই।

পুলিশ বলে, চশমার সঙ্গে লাইসেন্সের সম্পর্ক কি ?

ইটালি আর রোমানিয়ান মিশ্র ভাষায় বাংলাদেশি বন্ধুর জবাব, না মানে চশমা ছিলোনা বলে বাসার কোথায় লাইসেন্স আর গাড়ির রেজিস্ট্রেশন রেখেছি, তা দেখতে পাইনি আসার সময়,– প্রফাভর মসিয়ে।

তরুণ পুলিশ চোখ ছোট করে বলে, কাগজ নাই গাড়ির, লাইসেন্স নাই, গাড়ি চালাচ্ছেন উল্টাপথে, আবার গাড়ির সব বাহক ভিনদেশের ভিআইপি! এরা কি জেনুইন ভিআইপি? কোন দেশের এনারা? কাঁচ নামাতে বলেন।

আমি মনে মনে বলি, — খাইছে, বরিশাল আর যাওয়া অইবেনা।

বন্ধুটি একটুও না ঘাবড়ে বলে যায়, এই সাদা চামড়া সুইডেনের ভিআইপি, এই বাদামী চামড়া ভিআইপি ফ্রম ইংল্যান্ড, আর আমাকে দেখিয়ে বলে এই দাড়িওয়ালা ভিআইপি ফ্রম বাংল্যান্ড। অনুমান করলাম মলদোভাতে বাংলাদেশকে মনে হয় বাংল্যান্ড ডাকে।

বাংলায় বন্ধুকে বললাম, ভাই এইডা কি কইলেন, আমগো দেশের নাম বদলাইলেন, ভিআইপি বানাইলেন, মিথ্যা তথ্য দিয়া ভিত্রে হানদানোর ব্যবস্থা করতেছেন ক্যান?

—চুপ থাকেন আরিব্বাই। আমগো দেশের নাম কইলে বহুত ঝামেলা আছে, আপনেরে অনেক কিছু জিগাইবো, ক্যামনে আইলেন, ক্যান আইলেন। পাসপোর্ট দেখতে চাইলে কইবেন আমগো দেশের ইংরেজি নাম ঐডা জেডা কইছি। আমি দারুন টেনশনে পড়ে গেলাম।

অগত্যা বিপদে পড়লে যা করি আমরা, চুপ করে দোয়া ইউনুস পড়তে লাগলাম। লাইলাহা ইল্লা আনতা…। বাঙালীর আর কিছু না থাকলেও দোয়া তো আছে।

দোয়ার ইফেক্ট সঙ্গে সঙ্গে। পুলিশ মিয়া দেখি কারে যেন ওয়ারলেস করতেছে। অন্য পাশ থেকে কম বয়সী এক তরুণীর কন্ঠ শুনে মনে হলো এই পুলিশের বস হবে ওপাশের জন।

সুন্দরী বস (গলা শুনে সেটিও মনে হয়েছে) তাঁর সিপাহীর মুখে সব রিপোর্ট শুনে আমার বন্ধুর সাথে কথা বলা শুরু করলো।

বন্ধুটির উচ্চারিত দু চারটি শব্দ শুনে বুঝলাম, সে
নির্দ্বিধায় আবার একই কথা বলে যাচ্ছে, চশমা হারিয়েছে তাই চোখে দেখে নাই, কাগজ খুঁজে পায় নাই, ইংল্যান্ড, বাংল্যান্ডের ভিআইপিদের তাড়াতাড়ি বিমান বন্দর পৌঁছাতে হবে।

আরো কিছু আলাপ হচ্ছে, ওয়ারলেসে তরুণী বস হাসে, আমার বন্ধুও হাসে, পুলিশটাও মুচকি হাসে, টি, কফি জাতীয় কি কি যেন বলে আমার বন্ধু মলদোভার পঞ্চাশ লেইয়ের একটা নোট বাড়িয়ে দিলো পুলিশের দিকে, — পুলিশ ধরেনা।

হায় হায় ইউরোপের রাস্তায় পুলিশকে প্রকাশ্যে উপঢৌকন! জেলে মনে হয় যেতেই হবে। আমি দোয়া ইউনূসের স্পিড বাড়িয়ে দিলাম। আজব ব্যাপার, এবারও লাগলো দোয়া।

ছোট পুলিশটি সলজ্জ ভাবে এবার আমার দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে বললো, ফিফটি ইউরো। আমার বন্ধুটি যা দিয়েছে তার মূল্যমান মাত্র আড়াই ইউরো।

আমার মানিব্যাগে সর্বশেষ দুইশ লেইর একটা নোট ছিল যাতে দশ ইউরো হয়। আমি তাড়াতাড়ি সেটি পুলিশের হাতে দিতেই সে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলে, থ্যাংকিউ। ওকে গো গো, হোয়ার ইজ ইওর বাংল্যান্ড স্যার, ইজ ইট ইন আফ্রিকা?

আমার বন্ধুটির ভাব এমন যে কোন প্রশ্নই সে শোনেনি, গাড়িতে টান দিতে দিতে কেউ কেউ করে উঠলো, এত্তগুলা টাকা দিলেন, একশ লেই দিলেই তো হইতো।

আমি বললাম রাখেন মিয়া, আমি কি জানি ইউরোপের ট্রাফিক আমগো দেশের মত ঘুষ খায়? আমিতো আরেকটু হইলে হার্ট ফেল করতাম।

বন্ধুটি বলে, কিসের ঘুষ? আমগো ভুল ধরা পড়লে ওরা জরিমানার টাকাটা নিজেদের পকেটে ঢুকায়, ঘুষ খায়না। এই দেশের পুলিশের বসেরা জাইনা শুইনা সিপাইগো এই সুযোগ দেয়। আমি সেইটাই বার্গেন করতেছিলাম। আমগো দেশে ভুল করেন আর ঠিক করেন বাস ট্রাক সিএনজি বেচারাদের রাইতের বেলার চেকপোস্টে মাল দিতেই হয়, সেইডা আর এইডা কি এক হইলো?
আমার বন্ধুটির ব্যাখ্যা আমার না পছন্দ হইলো না বিশ্বাস হইলো।
অনেক দেশেই আমরা বাঙালিরা তাদের পুলিশকে উল্টাপাল্টা শিখাইছি, আজকে নিজের চোখে দেখলাম।

দোয়া ইউনূসের অপব্যবহার করার জন্যে এখন ইস্তাম্বুলের ট্রানজিট লাউঞ্জে বসে ওয়াস্তগফেরুল্লাহ পাঠ করতেছি আর তুর্কিশ চায়ে চুমুক দিতেছি।

পছন্দের আরো পোস্ট