যা শেখায় নিউইয়র্কের স্কুলে প্যারেন্টস টিচার কনফারেন্স

রিমি রুম্মানঃ

সাধারণত নিউইয়র্ক সিটির স্কুলগুলোতে প্যারেন্টস টিচার কনফারেন্স হয় বছরে ৩/৪ বার। সন্তানের অগ্রগতি জানবার জন্যে, শিক্ষকদের সাথে আলোচনার এটি চমৎকার একটি সুযোগ। এবং গুরুত্বপূর্ণও বটে।

সন্তানের অভিভাবক হিসেবে আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জন প্রতিটি প্যারেন্টস টিচার কনফারেন্সে যেভাবেই হোক সময় করে উপস্থিত থাকি। নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ আগে যাবার চেষ্টা করি যাতে ক্লাস রুমের বাহিরের দেয়ালে নোটিশ বোর্ডে টানানো প্রতিটি শিশুর ক্রিয়েটিভ রাইটিংগুলো পড়ে দেখার সুযোগ হয়। এতে সেই ক্লাসের শিশুদের মেধা, লেখার ধরণ কিংবা লেখার নিয়ম কানুন সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। এবং কেমন লেখা হলে কেমন নাম্বার দেয়া হয়, সেই ধারণাও হয়।

কিছু শিশুর লেখা খুব চমৎকার গুছানো, আবার কারো কারোটা বেশ এলোমেলো। প্রতিটি মিটিং এ সন্তানের প্রশংসা শুনে ফুরফুরে মনে বাড়ি ফিরে আসি। একটা সময়ে আমার ধারণা জন্মে যে, এখানকার স্কুলগুলোতে সম্ভবত শিশুদের ভুল ত্রুটি নিয়ে অভিভাবকের সাথে আলোচনা হয় না। শুধুই প্রশংসা আর প্রশংসা। সেই সময়ে আমার ছেলেটি থার্ড গ্রেডে পড়ছিল। যেহেতু প্রতিটি শিশুর অভিভাবকদের জন্যে নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ থাকে, তাই আমি প্রতিবার বাসা থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার জন্যে ছোট কাগজে নোট টুকে নিয়ে যাই যাতে কোন একটি বিষয়ও ভুলে না যাই।

এক কনকনে শীতের বিকেল। পি এস নাইনটিন স্কুলে প্যারেন্টস টিচার কনফারেন্স। শ্রেণি শিক্ষক মিস রেনে আমাদের সাথে হ্যান্ডশেক করে মুখোমুখি রাখা চেয়ারে বসতে বলেন। সামনে রাখা ফাইল দেখে ক্লাসে আমার সন্তানের পড়াশোনা সম্পর্কিত সকল অগ্রগতি অবহিত করেন।

অতঃপর একজন নামকরা টিভি সাংবাদিকের ( এই মুহূর্তে নাম মনে পড়ছে না) সাথে তুলনা করে বলেন, তোমার সন্তানের কথা বলার ধরণ একেবারেই তাঁর মতন। কোন অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না। যা বলে খুব ধিরে চিন্তা ভাবনা করে বলে। তাকে যদি ক্লাসে কোন প্রশ্ন করা হয়, সে খানিক চুপ থাকে, তারপর একেবারেই সঠিক উত্তরটি দিতে চেষ্টা করে।

এ পর্যন্ত শুনে বাবা-মা হিসেবে গর্বে আমাদের বুক ভরে উঠে। মিস রেনে আবারো বলতে শুরু করেন, অন্য শিশুদের সাথে তার ব্যবহার খুবই অমায়িক এবং সহায়তা পরায়ণ। ওয়াং নামের এক সহপাঠী ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার পরও তার কোন অভিযোগ নেই, এটিও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন।

আমরা ছলছল চোখে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। আর ভাবছিলাম, আমাদের সন্তান বাবা-মা আর দাদুর কড়া শাসনে সঠিকভাবেই বেড়ে উঠছে। একদিন উপযুক্ত মানুষ হয়ে উঠবে নিশ্চয়ই। আমাদের অবাক করে দিয়ে মিস রেনে কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তিত স্বরে বললেন, বিষয়টি খুবই ভাবনার এবং অস্বাভাবিক।

আমরা এক পৃথিবী বিস্ময় নিয়ে শ্রেণি শিক্ষক মিস রেনের দিকে তাকালাম। তিনি বললেন, ‘ এটি শিশুর বেড়ে উঠবার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। আমি নিশ্চিত, তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এবং আত্মবিশ্বাস কম ‘।

এমনটি কেন মনে হচ্ছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে মিস রেনে জানান, একটি শিশু বড়দের মতো করে ভেবে চিন্তে একেবারে শতভাগ সঠিক উত্তর দেয়াটা স্বাভাবিক লক্ষণ নয়। তার উত্তরগুলো হওয়া উচিত ঝটপট। হোক তা ভুল কিংবা নির্ভুল। অন্য সহপাঠীদের সাথে তার আচরণ হওয়া উচিত হাসি-আনন্দ, মান-অভিমান আর ঝগড়া-বিবাদের। কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে শিশুরা কাঁদবে, শিক্ষকের কাছে অভিযোগ করবে, এমনটিই তো হবার কথা, কী বল ?

তিনি আমাদের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকান। আমাদের জন্যে নির্ধারিত সময় ফুরিয়ে যাওয়ায় তিনি হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে বিদায়ের সময় শুধু বলেন, তাকে কঠিন নিয়মের মাঝে বেঁধে রেখো না। তার মতো করে বেড়ে উঠবার সুযোগ দাও, আশা করি তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ব্যহত করবে না।

মিস রেনের শেষের কথাগুলো বেশ কঠিন শোনাল সেদিন। বাড়ি ফিরবার পথটুকু আমরা তীব্র মনখারাপ আর নিস্তব্দতায় হেঁটে যাই। ভাবি, কোথাও কী ভুল হচ্ছে আমাদের ? রোজ স্কুলে যাবার পথটুকু আমি তাকে এতদিন শিখিয়েছিলাম, স্কুলে গিয়ে দুষ্টামি করবে না, বেশি কথা বলবে না, চুপটি করে বসে থাকবে, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে না, সবসময় সঠিক উত্তরটি দেবার চেষ্টা করবে… ইত্যাদি।

অথচ সেই সময়টায় তার ভোরের হাওয়া গায়ে মেখে ফুল, পাখি, সবুজ বৃক্ষ কিংবা আকাশ দেখতে দেখতে স্কুলে যাবার কথা। মাকে নানান রকম উৎসাহব্যঞ্জক প্রশ্ন করবার কথা। সহপাঠীদের দুষ্টুমির গল্প করবার কথা। আমি কী তাকে রোবট বানিয়ে ফেলছি ? তার সুন্দর শৈশব জটিল এবং কঠিন করে তুলছি ? ক’দিন এমন প্রশ্ন ঘুরপাক করছিল মনের ভেতরে।

তখন এই শহরে বসন্তের শুরু সবে। গাছে গাছে অপ্রস্ফুটিত ফুল। দীর্ঘ ক্লান্তিকর শীত শেষে বসন্তের প্রথমভাগে শহরের মানুষজনের এখানে ওখানে বেড়াবার দিন। এমনই এক সন্ধ্যায় কুইন্স ব্লুবারডে এক আত্মীয়ের বাসায় নিমন্ত্রণ। অতিথি কেবল আমরা দুই পরিবার। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আমি আমার ছোট্ট ছেলেটিকে এটা সেটা ধরতে বাঁধা দিচ্ছিলাম। এ রুম সে রুম ছুটোছুটি না করে চুপচাপ বসে থাকার জন্যে চাপ দিচ্ছিলাম। সেখানে বেড়াতে আসা অন্য পরিবারটি আমার মামা-মামী। আচমকা মামা বলে উঠলেন, শিশুদের খেলাধুলা, চলাফেরায় কখনোই বাঁধা দেয়া ঠিক নয়। খেলুক না নিজের মতো করে, ছুটাছুটি করুক স্বাধীনভাবে। এসব তো অন্যায় নয় ! আমি আমার ছোট্ট ছেলেটির হাতের মুঠি শক্ত করে ধরা ছিলাম, যেন অন্যের বাসায় এটা সেটা ধরে তাদের বিরক্তির কারণ না হয়।

আমি খুব ধিরে তার হাতটি আলগা করে দিলাম। আমার সেই শ্বেতাঙ্গ শ্রেণি শিক্ষক মিস রেনের কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। নিজের ভেতরে উপলব্ধি হোল, হ্যাঁ তাই তো ! আমি একটি শিশুর বেড়ে উঠবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছি কেন ! আমার সন্তান তো আমার ছোটবেলার মতো করে বাহিরের খোলা মাঠে ঘুড়ি উড়াতে পারছে না, ফুটবল খেলার সুযোগ পাচ্ছে না, গোল্লাছুট কিংবা এক্কাদোক্কা কিছুই না। নিয়ম শৃঙ্খলা আর শাসনের নামে তার শৈশবকে বিষিয়ে তোলা কিংবা জীবনকে বিপন্ন করে তোলার কোন অধিকার নেই কারোরই।

চলার পথে প্রতিনিয়ত এই যে শিক্ষা, এই যে উপলব্ধি কিংবা বোধ, এ কেবল আমাদের চারিপাশের ভালো কিছু মানুষ আর প্রকৃতির কারণেই হচ্ছে, আমার বিশ্বাস। প্রতিটি শিশুর চলার পথ হোক মানসিক চাপহীন, মসৃণ, এবং স্বাচ্ছন্দ্যময়।

 

রিমি রুম্মান,কুইন্স, নিউইয়র্ক

পছন্দের আরো পোস্ট