নিশ্চুপ নায়াগ্রা:কি ঘটে, যখন জমে যায় এই জলদানব!

ইয়াজিম পলাশ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

নায়াগ্রা নামটি এসেছে নায়া-গারা থেকে। নায়া-গারার অর্থ হলো দেবতার গর্জন। তিনটি পাশাপাশি অবস্থিত ভিন্ন জলপ্রপাত নিয়ে নায়াগ্রা জলপ্রপাত গঠিত। এই তিনটি জলপ্রপাতের নাম: হর্সশু ফলস বা কানাডা ফলস, আমেরিকান ফলস এবং ব্রাইডাল ভিল ফলস। নায়াগ্রা জলপ্রপাত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত।

এতে প্রায় ১৬৭ ফুট উপর থেকে পানি পড়ে। প্রতি সেকেন্ডে এক মিলিয়ন গ্যালন। প্রথম যে মানুষটি নায়েগ্রা জলপ্রপাত দেখেন তার নাম জন লুইস হেনিপ্যান। একজন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক। রেড ইন্ডিয়ানদের বাণী পৌঁছানোর জন্য তিনি নিজের জীবন নিবেদন করেছিলেন। ১৬৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি এই জলপ্রপাতের সামনে এসে উপস্থিত হন। বিস্ময়ে তার বাক রুদ্ধ হয়ে যায়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থনায় বসেন। প্রার্থনা শেষে উচ্চস্বরে বলেন-‘প্রকৃতির এ মহা জলরাশির তুল্য বিশ্বব্রহ্মা-ের আর কোথাও নেই। থাকতে পারে না।’

গোট আইলান্ডে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের মুখোমুখি দাঁড়ালে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করবে জলপ্রপাতের দিকে। মনে হবে, যে বিস্ময় তিনশ বছর আগে ফাদার হেনিপ্যানকে অভিভূত করেছিল, সেই বিস্ময় আমাকেও গ্রাস করেছে। যেনো প্রকৃতির ভয়ংকর সুন্দররূপ দেখছি।

এটা তো নায়াগ্রা জলপ্রপাতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। কিন্তু এই বিশাল জলরাশির এই জলপ্রপাতকে হঠাৎ থমকে যেতে দেখলে! পুরোপুরি নিশ্চল হয়ে যেতে দেখলে কেমন হবে সেই সময়টা? রূপকথার জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বরফে পরিণত হলো পুরো জলপ্রপাতটি। তখন কেমন দেখাবে দৃশ্যটা? তখন দৃশ্যটা ইহজাগতিক কোন দৃশ্য বলে মনে হবে না। মনে হবে অন্য কোন ভুবনের দৃশ্য। এটা কল্পণার কথা বলছি না! তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, আসলেই কি নায়াগ্রা জলপ্রপাত বরফে পরিণত হতে পারে? হ্যা! নায়াগ্রা জলপ্রপাত বরফে পরিণত হতে পারে।

ওয়াশিংটন পোস্টের মতে নায়াগ্রা জলপ্রপাত হিমায়িত হওয়া অস্বাভাবিক কোন ব্যাপার না। নায়াগ্রা জলপ্রপাত প্রতি বছরই শীতল। সাধারণত জানুয়ারিতে এর গড় তাপমাত্রা থাকে ১৬ ও ৩২ ডিগ্রি।

তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের ৮ ডিগ্রি থেকে ১৬ ডিগ্রি নিচে নেমে যায় তখন মারাত্মক ঠান্ডায় কাঁপতে থাকে সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা। কানাডার কোথাও তো তাপমাত্রা নেমে যায় দক্ষিণ মেরুর তাপমাত্রার কাছাকাছি। তখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নায়াগ্রা জলপ্রপাত মারাত্মক ঠান্ডায় জমে যায়।

অর্থাৎ, গভীর গর্জন স্বত্ত্বেও, শীতকালে অবস্থার ওপর নির্ভর করে নায়াগ্রা জলপ্রপাত এখনো বরফে পরিণত হতে পারে। মাঝে মাঝে এতে ‘আইস ব্রিজ’ও তৈরি হয়। বেশ কয়েকবার জমে গিয়েছিলো নায়াগ্রা জলপ্রপাত। পোলার ভার্টেক্স বা মেরুপ্রবণ ঘূর্ণাবর্তের দরুণ, ২০১৪ সালে নায়াগ্রা জলপ্রাতটি আংশিকভাবে হিমায়িত হয়ে নিথর হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া ১৮৪৮ সালের মার্চ মাসে বরফের কারণে নায়াগ্রা জলপ্রপাত বন্ধ হযয়ে গিয়েছিলো এবং ৪০ ঘণ্টা পর্যন্ত কোনো পানি পড়েনি। ফলে জলবিদ্যুৎ কারখানার চাকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, বিদ্যুতের অভাবে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। এছাড়াও ১৯১১ সালে ও ২০১৫, ২০১৭ সালে নায়াগ্রা জলপ্রপাত নিশ্চল হয়ে গিয়েছিলো।

যখন নায়াগ্রা জলপ্রপাত জমে নিশ্চল হয়ে যায় তখন কিছুটা হলেও ভৌতিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। শীতে বরফ জমার ফলে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় দেখা যায় অন্যরকম দৃশ্য। জলপ্রপাতের আশেপাশে যে গাছগুলো ঘন পাতায় আবৃত থাকে, সেই গাছগুলোর পাতা সাদা ধবধবে তুষারের পাতায় পরিণণত হয়। জলপ্রপাতের আশপাশের পাথর, দেয়াল আর রেলিংগুলোতে চুইয়ে পড়া পানি জমে শক্ত হয়ে যায়। দেখে মনে হবে যেন, এটা স্বচ্ছ কোনো কাচের কারুকার্য।

উজ্জ্বল স্নিগ্ধ স্পষ্ট দিনগুলিতে যখন আকাশ নীল এবং তুষার উজ্জ্বল সাদা, সেই সময়ে এই বরফ ভাস্কর্যগুলি হিমায়িত প্রাকৃতিক শিল্পে পরিণত হয়। যা কোথাও প্রতিলিপি করা যাবে না! আর জলপ্রপাত দিয়ে বয়ে যাওয়া পানিও ঠিক যেনো বরফে পরিণত হয়। তখন দেখে মনে হয় এ যেন ররফের কোন রাজ্য। আবার মাঝে মাঝে মনে হবে জলপ্রপাত দিয়ে বয়ে যাওয়া পানিও যেন ঠিক বরফ নয় আবার একেবারে তরলও নয়। ঘন কুয়াশার আড়ালে এই পানির প্রবাহটাও তৈরি করে এক অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের। কখনও কখনও সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে বরফ থেকে প্রতিফলিত হয়ে চারদিক থেকে এক অদ্ভুত আলো ছড়াচ্ছে। যা মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

আর রাতে চাঁদের আলো পড়ে এতে অলৌকিক দৃশ্যের অবতারণা হয়। যেনো চারদিকে হীরার আলো ছড়িয়ে আছে, বরফখন্ডগুলোকে মনে হয় একেকটি হীরকখন্ড। আর তা থেকে যেনো কেমল ঠান্ডা আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। যে দৃশ্যের সাথে পৃথিবীর সচরাচর কোন দৃশ্যের মিল নেই।

শীতকালে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সৌন্দর্যে আরো একটি মাত্রা যোগ করেছে রাতে আলোকসজ্জার সময়। বরফে বিভিন্ন রঙের আলোর রঙধনুর খেলার মধ্য দিয়ে জলপ্রপাতকে আশ্চর্য সুন্দর মনে হবে। ১৯৪৮ সালের পর থেকে প্রতিবছর নভেম্বরের শুরু থেকে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত শীতকালীন লাইটিং উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২০ মিলিয়নের বেশি লাইট এবং ১২৫ টি অ্যানিমেটেড আলো প্রদর্শন করা হয়। আর পুরো অনুষ্ঠানটি সবার জন্য ফ্রি। এবং সবাই মিলে এখানে নববর্ষ উৎযাপন করা হয়।

সবমিলে নায়াগা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক, জাদুকর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক প্রতীক। এর মোহময় আকর্ষণকে কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না।#

ইয়াজিম পলাশ,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পছন্দের আরো পোস্ট