কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ, কৃষক প্রধান নয়

সাব্বির আহমেদঃ

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হিসাবেই সুপরিচিত। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের পরিচয় কৃষিপ্রধান বটে কিন্তু কৃষক প্রধান নয়। কৃষকের অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। বাংলাদেশের কৃষকদের আর্থিক অবস্থা আজ শোচনীয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে কৃষকের বেহাল দশা। যে অনুপাতে বাংলাদেশের উন্নতি হচ্ছে, মানুষের আয় বাড়ছে তার ঠিক ব্যাস্তানুপাতিক হারে কমছে  কৃষকের আয়। যে কৃষিজীবী মানুষগুলো সারাদেশের মানুষের অন্ন জোগায় তাদের পেটে যদি ভাত না থাকে, শরীরে যদি পোশাক না থাকে তাহলে কি দেশের উন্নতি হবে?

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের শতকরা আশিজন লোকের জীবিকা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে কৃষির উপরর নির্ভরশীল। অবশিষ্ট  বিশ জন মাত্র শিল্প, ব্যবসায়, চাকরি ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। সুতরাং বাংলাদেশ কৃষকের দেশ অথবা কৃষিপ্রধান দেশ একথা বললে হয়তো ভুল হবে না। অথচ, ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস, এদেশে কৃষকরাই সর্বাধিক অবহেলিত এবং তাদের অবস্থাই সবচেয়ে বেশি শোচনীয়।

বাংলাদেশ যে আজকে উন্নত দেশের কাতারে উঠে আসছে তার মূল হাতিয়ার কিন্তু এই কৃষি। অবকাঠামোগত উন্নয়নের মূল ভিত্তি বলা চলে কৃষিক্ষেত্রকে। কারণ অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বেশিরভাগ অর্থের যোগান আসে কৃষিক্ষেত্র হতে। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কৃষিজাত পণ্য। বিভিন্ন ধরনের কৃষিজাত পণ্য  রপ্তানি করে কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা লাভ করছে বাংলাদেশ।  বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধান উৎপাদিত দ্রব্য হল শাকসবজি, ফলমূল ও তরিতরকারি। এরমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধান উৎপাদিত দ্রব্য হল পাট।

২০১৮ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, এটি মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ ভাগ যোগান দিয়ে থাকে এবং দেশের জিডিপিতে এর অবদান ১৪.১০ শতাংশ। এটা স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে এদেশের সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে কৃষির ওপর। অথচ আমাদের দেশে কৃষকেরা সবচাইতে বেশি বঞ্চিত, অবহেলিত ও অভাবগ্রস্ত। শোনা যাচ্ছে দেশে শুধু উন্নয়ন আর উন্নয়ন। হ্যাঁ উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই কিন্তু শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে সবকিছুর বিচার করা মনে হয় ঠিক হবে না। বড় বড় দালান কোটা, বড় বড় ফ্লাইওয়ার, বা ব্রিজ নির্মাণ করে দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে চাওয়া মনে হয় এক অর্থে বোকামিই হবে। দেশের সাধারণ মানুষের উন্নয়নের কথা চিন্তা করতে হবে আর মনে রাখতে হবে কৃষকের উন্নতি না হলে দেশের সামগ্রিক উন্নতি কোনোদিন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি,আধাসরকারী চাকরিজীবীদের সাম্প্রতিক বাজারমূল্যের উপর নির্ভর করে বেতন বাড়ানো হয় প্রায় প্রতিবছর।

বিভিন্ন স্কেলে চলে বেতন বাড়ানোর প্রক্রিয়া। বেতনের সাথে সাথে বছরে তিন চারটা বোনাস তো আছেই।  ঈদুল ফিতর,ঈদুল আজহা,পূজা, পহেলা বৈশাখের বোনাস। সবথেকে অবাক করা বিষয় হলো পহেলা বৈশাখ যেসব মানুষদের জন্য তাদের দিকে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নাই।  বর্তমানে পহেলা বৈশাখ কৃষদের জন্য নয়,অভিজাত শ্রেণীর মানুষদের জন্য।  দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন যেসকল মানুষ তারাই আজ সবথেকে বেশি শোষিত।তাদেরকে নিয়ে ভাববার কেউ নাই।

এদেশের যাবতীয় সম্পদ অর্জিত হয় কৃষির মাধ্যমে। কৃষির সাহায্যেই আমরা আমাদের খাদ্যশস্য, শাকসবজি, ফলমূল ও তরিতরকারি উৎপাদন করি।

তাই কৃষক এদেশের জন্য আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে আসে। অথচ কৃষক না বাঁচলে কি বাঁচবে দেশ? প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে।  প্রশ্নটা আজ কৃষকের অস্তিত্বের প্রশ্ন। কারণ অনেক কৃষকই বর্তমানে নিঃস্ব হয়ে কৃষিকাজে ইস্তফা দিচ্ছেন। বর্তমানে ১ কেজি ধানের মূল্য ১২ টাকা অথচ আধাকেজি পানির মূল্য ১৫ টাকা। এক মণ ধানের দাম ৫০০ টাকা আর একটি কৃষি মজুরির মূল্য এলাকা ভেদে ৫০০ থেকে ৮৫০ টাকা । ফলে মাঠ থেকে ধান কেটে নিয়ে আসলে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। কৃষক কৃষিকাজ করে লাভের আশায়।  কিন্তু কৃষিকাজের পূর্বেই তাদের ক্ষতির পরিমাণ পরিমেয় বলে অনেকেই কৃষিকাজকে তাদের জন্য অভিশাপ হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন। যারা একসময় দেশের জন্য আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে আসতেন তারাই যদি বর্তমানে কৃষিকে অভিশাপ হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করেন, তাহলে দেশের ভবিষ্যত উন্নয়ন অনিশ্চিত তা হলফ করে বলা যায়।

কৃষকদের এই শোচনীয় অবস্থা যেন একরকম অবধারিত।  কারণ স্বাধীনতার পরে দেশের সকল স্তরে যেভাবে উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে তার সামান্যতমই কৃষিক্ষেত্রে লেগেছে। কৃষিপ্রধান এই দেশে আজকে কৃষি পণ্যটাই বেশি দামি। অথচ কৃষিপণ্য উৎপাদনকারীরা সহজাত পণ্যে রূপ নিয়েছেন। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের কদর থাকলেও এদেশে কৃষকের কদর নাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী উন্নয়নে কৃষিকাজ যেভাবে অবদান রেখে চলেছে তা অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা স্বীকার করতে একরকম নারাজ৷ আর দেশের রাজনীতিবিদদের কথা নাহয় বাদই দিলাম৷  কারণ অনেক রাজনীতিবিদেরা তো এখনো সংশয়ে আছেন যে এদেশে কতজন কৃষিকাজ করেন। অনেক অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা এখন প্রশ্ন করেন, দেশের উন্নতির জন্য সব শ্রেনীর মানুষকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে কি? দেশের উন্নতি শুধুমাত্র গুটিকয়েক মানুষ অথবা অঞ্চলের উন্নয়ন নয়। দেশের সকল মানুষকে সাথে নিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমেই একটি দেশ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের সোপানে আরোপিত হয়।

বাংলাদেশ যখন কৃষিপ্রধান দেশ এবং কৃষিই যখন এদেশের প্রধান সম্পদ তখন কৃষকদের উন্নয়নের দিকে সুনজর দিতে হবে আমাদের। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে হবে। ভূমিহীন কৃষকদের ভূমি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিঋণ যেন ঠিকমতো ভূমিহীন কৃষকদের হাতে পৌঁছায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের কাছে স্বল্পমূল্যে সার ও কৃষিসরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। অসাধু ব্যাবসায়ীদের জিম্মি থেকে কৃষকের মুক্ত করতে হবে। আমাদের কে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে তার সমাধান দিতে হবে। যেমন, আমরা চাউল ক্রয় করি ৫০ টাকা কেজি হিসেবে, আর কৃষক চাউল বিক্রয় করে ১২/১৪ টাকা হিসেবে। তাহলে বাকি ৩৮ টাকার হিসাব গেল কোথায়?  বাংলাদেশের কৃষক যতদিন না এই ৩৮ টাকার হিসাব পাবে ততদিন দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যতীত আর্থসামাজিক উন্নয়ন স্বপ্নই থেকে যাবে৷

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষকের এখন  দুরবস্থা। ধান সহ সকল প্রকার কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে অদূর ভবিষ্যতে কৃষকের জমি থাকবে কিন্তু কৃষি কাজ করার মতো কৃষক থাকবে না।  তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবিষয়ে সরকারের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তনের মাধ্যমে কৃষির উন্নতি হলে, বাংলাদেশ হয়ে উঠবে সত্যিকারের সোনার বাংলা।

লেখকঃ সাব্বির আহমেদ,বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া

পছন্দের আরো পোস্ট