`অামার খুব বড় হবার স্বপ্ন ছিল,কবি হবার নয়’

দীর্ঘ সাত বছর ধরে লেখালেখি করেও বয়স এখনও মাত্র একুশ। অনেকদিন অবধি পাঠকের আড়ালে থাকলেও বর্তমান সময়ে এসে বাংলা কবিতায় ঘটিয়েছে নব বিপ্লব; নতুন বিস্ময়রূপে আবির্ভূত হয়েছে নতুন প্রজন্মের তারুণ্য ও প্রেমের কবি হিসেবে। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা চার; রয়েছে দ্বিতীয় সংস্করণও।

অনেকের মতে, গ্রন্থ সংখ্যা পাঁচ। সবকয়টি গ্রন্থই কবিতার; ইতোমধ্যে পাঠকমহলেও ফেলেছে ইতিবাচক সাড়া। বলছিলাম, সমসাময়িক বাংলা কবিতার অন্যতম তরুণ কবি ফয়সাল হাবিব সানি’র কথা। আজ এ তরুণ কবি’র জীবনের নানা দিক ও কবিতায় তার সংগ্রামী পথচলা শীর্ষক নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক সাব্বির আহমেদ।

আপনাকে এ সময়ের প্রেমের ও তারুণ্যের কবি হিসেবেই অভিহিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?

উত্তরঃ দেখুন, মানুষ তার ভালোলাগার জায়গা থেকে ভালো কিছু করতে চায়। কালক্ষেপণে খারাপ কিছুও। আমি মনে করি, ভালোলাগার জায়গাটা থেকেই ধীরে ধীরে ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়। কবিতাও আমার কাছে এখন অত্যন্ত ভালোবাসার জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। আমার কর্মই প্রমাণ করবে আমি কি? দআমি কে? তা নয় কিন্তু’। আমার লেখা মানুষের ভালো লাগলে মানুষ তার ভালোলাগার জায়গা থেকে কিছু বলতেই পারে, এমনকি সমালোচনাও করতে পারে। অর্থাৎ, ভালোবাসার জায়গাটা থেকেই হয়ত তারা আমাকে এ সময়ের তারুণ্য ও প্রেমের কবি বলে থাকছে। আমার উদ্দেশ্য তাদের ভালোবাসার জায়গাটাকে ধরে রাখা, তাদের ভালোবাসাকে যথাযথভাবে সম্মমানন দদেখানো। ভালোবাসা কিন্তু চাাইলেই সকলে পায় না। তাই নিঃসন্দেহে এখন আমার লক্ষ্য আরও ভালো কিছু করার প্রত্যয় মনের মধ্য পুষে সেইটাকে উপযুক্তভাবে কাজে লাগানো।

কবিতা দিয়ে আপনার সাহিত্যে আসা। এমনকি আমাদের জানা মতে, আপনি কবিতা ছাড়া আর কিছুই লেখেন না। এই যে কবিতার প্রতি এত ভালোবাসা সৃষ্টির কারণটা কি?

উত্তরঃ আমার কাছে মনে হয়েছে, কবিতা মানুষকে বাঁচতে শেখায়, জানতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। কবিতা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ। কবিতা যতটুকু নিজের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা-চেতনাকে ও নিজের ভাবনাগুলোকে আলোড়িত করতে পারে, সাহিত্যের অন্যান্য শাখা হয়তবা তেমনটা পারে না। কবিতা এক সুবিস্তৃত, সুপরিশীলিত, সুসংবদ্ধ বোধের বহিঃপ্রকাশ। যেখানে বোধ নেই, সেখানে কবিতা নেই। বোধের গভীর কোনো স্তরের ভাবনাময় উৎকর্ষতাই আমার কাছে কবিতা। হয়ত এ সকল কারণেই কবিতা আমার কাছে এত বেশি প্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে আমি মনে করেছি, কবিতা দিয়ে পাঠকের চিত্তে নিজের জন্য একটা স্থান গড়ে তোলা।

আমি পাঠকপ্রিয়তা চায়নি, তবে আমার লেখা যদি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে না পারি, মানুষের কাছে পৌঁছাতে অপারগ হয়- তবে তা আমার জন্য চরম ব্যর্থতা ও দুর্ভাগ্য হবে। তাই আমি বারবার ভেবে দেখি, আমার লেখা শুধু কবিতাগুলোই-ই আমি মানুষের কাছে কতটা পৌঁছে দিতে পেরেছি। মানুষ কতটা তা গ্রহণ করবে সেইটা মুখ্য বিষয় না। ধরুন, আমি কবিতা ছাড়াও সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় লেখালেখি করলাম, কিন্তু মানুষ তা জানলোই না, তাহলে আমার লেখার অর্থ দাঁড়ালো কি? অনেকে বলে থাকেন, লেখালেখিটা অনেকটা নিজের জন্যও, অন্যকে জানানোরই বা কি আছে? অন্যকে জানতেই বা হবে কেন? কিন্তু দেখুন, আমি যতটা না আমার জন্য লিখছি, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের জন্য লিখছি। এইটাই আমার ভাবনা। মানুষের মাঝে আমার লেখার বিস্তৃতি না ঘটলে আমি তাকে নেহাৎ অ লেখায় বলব। তাই হয়ত এই দুর্ভাবনা থেকেই সাহিত্যের এত শাখায় বিচরণ না করে আপাতত কবিতা নিয়েই পড়ে আছি।

কবিতা লেখার পেছনের কাহিনীটা যদি একটু বলেন?

উত্তরঃ প্রকৃতপক্ষে, দআমার খুব বড় হবার স্বপ্ন ছিল, কবি হবার নয়। কবি হবার স্বপ্ন আমি কখনোই দেখিনি। তবে কেন যেন আমি কবি।’ তবে ছোটবেলা থেকেই আমি ভাবতাম আমাকে একদিন অনেক বড় হতে হবে, এমনকি বিখ্যাতও। শৈশব থেকেই বিখ্যাত হবার প্রবল স্বপ্ন ছিল আমার। আমি মনে মনে ভাবতাম, আমি এমন কিছু করব যাতে করে পুরো বিশ্ব আমাকে চিনবে। মানুষ নশ্বর, কিন্তু আমি অবিনশ্বর অর্থাৎ অমর হতে চেয়েছিলাম। যদিও তা শরীরে নয়, মননে।

আমি চেয়েছিলাম এমন কিছু করে দেখাতে যার ফলস্বরূপ আমার মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে যেন আমি বেঁচে থাকি; পৃথিবী আমায় মনে রাখে। আমার একসময় বিজ্ঞানী হবার প্রবল ইচ্ছা ছিল। তখন আমি তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। আমি প্রচণ্ড টেলিভিশন দেখতাম তখন। টেলিভিশনে বড্ড আসক্তি তখন আমার। আমি ডিশ অ্যান্টেনা আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়েছিলাম সেই সময়ে। চুম্বক, তার, আরও ইলেকট্রিক সরঞ্জাম একত্রিত করে তা আবিষ্কারের বেশ চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু সফল হতে পারিনি। আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠামাত্র একটু বেশিই পড়াশুনা করতাম।

আমার অংকের প্রতিও ঝোঁক ছিলো। গণিতবিদ হবারও ইচ্ছে ছিল একসময়। তারপর ইচ্ছে জেগেছিল ক্রিকেটার হবার। তখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র, আমাদের দেশে তখন ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলা হয়েছিলো। দেশের প্রতি কী যেন এক প্রবল টান থেকে ক্রিকেটার হবার ইচ্ছেটা খুবই বেশি ঘাড়ে চেপে বসল। আর আশ্চর্য হলেও সত্যি, আর এই বড় ক্রিকেটার হবার স্বপ্ন থেকেই আমার কবিতা লেখার হাতেখড়ি।

ক্রিকেট খেলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি চেয়ে একদিন স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক বরাবর আবেদন করেছিলাম। তিনি আমাকে আশ্বস্তও করেছিলেন। এই আবেদনপত্রটির গুণগান গেয়েছিল স্কুলের শিক্ষক-সহপাঠী সহ অনেকেই। ভীষণভাবে উৎসাহিত হয়েছিলাম সেদিন। রাতে এসে ভেবেছিলাম, আমি নাকি এত সুন্দর করে আবেদনপত্র লিখতে পারলাম! আমি কি অন্য কিছু লিখতে পারিনা? কি লিখব? গল্প নাকি অন্যকিছু? মাথায় কবিতা লেখার চিন্তা এসেছিল।

এমনকি আমি চেয়েছিলাম ৫০০ লাইনের একটি সুবৃহৎ কবিতা লিখব যা আমাকে পৃথিবীতে বিখ্যত করে তুলবে। আর কোনোদিন কবিতা না লিখলেও চলবে, এই একটি কবিতাতেই আমি বিখ্যত হব। সেই সুবাদেই সেই রাতে জন্ম নেয় আমার লেখা ৭৬ লাইনের প্রথম সুবৃহৎ কবিতা দদস্বাধীনতার মর্মকথা”। তারপরের পথচলাটা ছিল খুবই করুণ ও হতাশার।

তারপরের পথচলাটা করুণ ও হতাশার বললেন কেন?

উত্তরঃ তারপর আমি নিয়মিত কবিতা লিখে চলেছিলাম। কিন্তু প্রকাশের কোনো মাধ্যম পায়নি। বিভিন্ন পত্রিকার জেলা প্রতিনিধিদের কাছেও ধর্না দিতাম। কিন্তু তারা আমার কবিতা না দেখেই অল্প বয়সের ছেলে ভেবেই ফিরিয়ে দিত। এমনকি পারিবারিক কোনো সাপোর্টও ছিল না। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমি আমার কবিতা তেমন কোথাও ছাপাতেও পারিনি। যাই হোক, সেই হতাশা, কষ্ট আর ক্লিষ্টের কাহিনী আজ নাই বা শুনালাম।

আপনি সবেমাত্র অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়াশুনা করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই সময়েই আপনার চারটি কবিতাগ্রন্থ। পূর্বে প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থের বেরিয়েছে দ্বিতীয় সংস্করণও। আমার জানা মতে, যা দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্রই করে দেখাতে পারেনি। কবিতায় এ সময়ে এসে আপনি নতুন বিপ্লব ঘটালেন। এক্ষেত্রে আপনার অনুভূতিটা কেমন?

উত্তরঃ এই বিষয়টাকে আমি খুব বেশি প্রধান্য দেওয়ার কিছু মনে করিনা। আমি আমার কাজ করে গেছি, হয়তো লিখেছি অনেক। তাই গ্রন্থসংখ্যও বেশি। এটা আসলে আহামরি কোনো বিষয় নয়। তবে ভালোলাগা তো অবশ্যই কাজ করে। বাড়তি উৎসাহ ও প্রেরণার উৎস বলতে পারেন।

আপনি বাংলাদেশ ছাড়া ভারতেও পাঠক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। এইটা কি এত অল্প বয়সে আপনার জন্য অনেক বেশিই প্রাপ্তি না?

উত্তরঃ হ্যাঁ, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের ম্যাগাজিনে আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় বাংলা সাহিত্য ওয়েবেও আমি লিখে থাকি। আমার বই প্রকাশের সময় ভারতের কিছু কবি, সাহিত্যিক ও পাঠকমহলের কাছ থেকেও অনেকটা উৎসাহিত হয়েছি। তারা আমার লেখা পড়ে এবং অনেকেই আমার লেখায় বেশ পঞ্চমুখ। এছাড়াও সবিশেষ বড় কথা, আমার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোরও ভূমিকা লিখেছেন ভারতের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কবি-সাহিত্যিক যা একজন উঠতি তরুণ কবি হিসেবে আমার কাছে অত্যন্ত বড় পাওয়া।

সবশেষে আপনার বই সম্পর্কে জানতে চাই এবং সামনের একুশে বইমেলায় কি নতুন কোনো বই আসবে আপনার এবং আসলেও সেইগুলো কিসের উপর লেখা হবে?

উত্তরঃ আমার চারটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে গেল অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ফেব্রুয়ারিতে। গ্রন্থগুলো যথাক্রমে দদদাবানল (২য় সংস্করন)”, দদনির্বাচিত ১০১ কবিতা”, দদনির্বাচিত পঞ্চাশ প্রেমের কবিতা” ও দদঅপ্রকাশিত কথন”। সবগুলো বই-ই কবিতার এবং সবগুলোই প্রকাশ করেছে নব সাহিত্য প্রকাশনী। বইগুলোর নামশুনেই হয়ত বুঝতে পারছেন, এ কবিতার বইগুলোর কিসের উপর লেখা। আর সামনের বইমেলায় আমার তিনটি কবিতার বই প্রকাশের সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে গবেষণাধর্মী কবিতার বই একটা, পুরোনো কবিতাগুলো মিলিয়ে কবিতাসমগ্রের বই একটা এবং অন্যটি প্রতিবাদের ৫০ কবিতা নিয়ে নতুন বই আসতে পারে। উল্লেখ্য, প্রতিবাদের ৫০ কবিতা বইটির প্রত্যেকটি কবিতাই ১০০ লাইন করে লিখবার ইচ্ছে আছে। অর্থাৎ, সবকয়টি কবিতাই দীর্ঘ কবিতা হবে।

অনেক ধন্যবাদ আপনাক সময় দেওয়ার জন্য। আপনার লেখালেখির সাফল্য এবং সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করছি। ভালো থাকবেন।

উত্তরঃ ধন্যবাদ, ভাই। আপনিও ভালো থাকবেন।

পছন্দের আরো পোস্ট