মধুর আমার মায়ের স্মৃতি

ঝলমলে শৈশবের স্বর্গীয় সে চৌচালা ঘরটির কথা খুব মনে পড়ে। হাড় কাঁপানো পৌষের শীতে মায়ের বুকের ওমে ভাইবোনদের মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়তাম কাঁথা-কম্বল ছাড়াই। আহা! ফেলে আসা মায়াময় সেই সব আদুরে দিনগুলো! রাতভর স্বপ্ন দেখতাম। আমার ছোটবেলার সে মাটির চৌচালা ঘরে স্বপ্ন দেখার মাঝখানে কখনো ঘুম ভাঙত না। যান্ত্রিক জীবনে আজ আমি আর পরিপূর্ণ কোনো স্বপ্ন দেখি না। স্বপ্ন দেখতে গেলেই যান্ত্রিক পৃথিবীর কোনো না কোনো গোলযোগে ঘুম ভেঙে যায়, সঙ্গে স্বপ্নও।

মায়ের কোল ফেলে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও এত এত বছর পেরিয়ে আজও প্রথম ভোরে সূর্য উঁকি দেওয়ামাত্র স্পষ্ট শুনতে পাই মায়ের দরাজ কণ্ঠের সুরা ইয়াসিন পাঠ। চোখের সামনে দেখতে পাই মায়ের নিষ্পাপ মুখ। বিদেশ থেকে বাবার পাঠানো সুরমা লাগানো মায়ের কাজল কালো চোখ।

এই ব্যস্ত শহরে দুপুর নেমে এলেই স্মৃতির মিছিলে হারিয়ে যাই; দিশেহারা হয়ে পড়ি। দীর্ঘশ্বাসগুলো যেন বুকের মাঝখানটায় জেঁকে বসে। ভীষণ নিঃসঙ্গ লাগে। চারপাশের মানুষগুলো সব ব্যস্ত দৌড় প্রতিযোগিতায়। কারও সময় নেই কারও সুখ-দুঃখের কথা শোনার। সবাই যেন অভাবগ্রস্ত। অভাব নামক অসুখে ভুগছে; আর পালিয়ে বেড়াচ্ছে আপন মানুষ থেকে। আমি তখন চোখ বুঁজে ভাবনার সাঁকোতে উঠে চলে যাই মায়ের কাছে। দুপুরের খাওয়া শেষে শীতল পাটিতে মায়ের কোলে শুয়ে বিশ্রাম নিই; আর আমার রাজ্যের সব গল্প মাকে বলি। মা খুব মনোযোগ দিয়ে আমার অদরকারি কথাগুলো শোনেন এবং হাতপাখা দিয়ে বাতাস করেন। আজও দুপুর এলেই রোবোটিক জীবনে শান্তি পাই মায়ের কোলে ছোটবেলার এই দৃশ্যগুলো ভেবে…।

সন্ধ্যা নামলেই নিয়ম করে এই শহরের সোডিয়াম বাতিগুলো যখনই জ্বলে ওঠে, তখনই স্পষ্ট শুনতে পাই মা ডাকছেন আমাকে চিমনি পরিষ্কার করে তাড়াতাড়ি হারিকেন ধরাতে। হারিকেনের নরম আলোয় মায়ের সেই হলুদ শান্ত চাঁদমুখ আমি আজও পাগলের মতো খুঁজি নিঃসীম শূন্যতায় অগণিত নক্ষত্রদের ভিড়ে। মায়ের মুখের নিষ্পাপ সে দ্যুতি ছাড়া দুনিয়ার কোনো আলো আমার চোখে স্থায়িত্ব পায়নি কখনো।

আমার কাছে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সুগন্ধী মায়ের গায়ের ঘ্রাণ। রাত যত গভীর হয়, ঘরময় সুগন্ধগুলো তত দৃঢ় হয়। এখনো মাঝরাতে মায়ের মুখভর্তি পানের গন্ধ পাই। মায়ের চুল ভর্তি সিনড্রেলা তেলের সুবাসে আমি বিভোর হয়ে পড়ি রাত-নিশীথে। মায়ের হাতে রান্না করা মিহি নারিকেল বাটা দিয়ে কবুতরের মাংসের সুঘ্রাণ যেন আজও সব খাবারের স্বাদকে ম্লান করে দেয়। চোখ বুজলেই দেখি বারান্দায় বাতাসে মায়ের শাড়ি পতপত করে উড়ছে, আর আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। আমার ঘুম ভেঙে যায়। আর ঘুম আসে না। মায়ের আদরের বুকের উঠোন থেকে অনেক দূরে বসতি গড়া আমার বাকি নির্ঘুম রাতটুকু কাটে জীবনের প্রয়োজনে ইট-কাঠে আবৃত এই শহরের লোহার খাঁচায় বন্দী ডানাভাঙা পাখির মতো।

সময় জীবন থেকে আমার মাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু মায়ের স্মৃতিগুলোকে কেড়ে নিতে পারেনি। স্মৃতির কশাঘাতে ইদানীং অসুস্থ হয়ে পড়ি। মানুষ হয়ে জন্মানোর অসংখ্য কষ্টের মধ্যে অন্যতম হলো স্মৃতির আঘাতে জর্জরিত হওয়া। স্মৃতি শুধু কাঁদায়।

জগতের সব গল্প শেষ হয়ে যায়। কিন্তু মায়ের সাথে সন্তানের গল্প চলতেই থাকে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত। যেখানেই আছেন ভালো থাকবেন মা…।

পছন্দের আরো পোস্ট