গুড লাক স্টুডেন্ট অব দ্যা মান্থ রিহান

আট বছরের ছোট্ট রিহান মাস দুয়েক আগে স্কুল ছুটি শেষে ভীষণ উচ্ছ্বাসে জানায়, সে ‘স্টুডেন্ট অব দ্যা মান্থ’ নির্বাচিত হয়েছে। আমি খুশি হয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরি, আদর দেই। সেইসময় স্রোতের মতো সব শিশুরা বাড়ির দিকে ফিরছিলো। সেইসাথে আমরাও। আচমকা রিহান গলা উঁচিয়ে কাউকে বলছে, ” হাই অ্যালান, তুমি কি জানো আমি স্টুডেন্ট অব দ্যা মান্থ হয়েছি ?” গোলগাল গড়নের মাশরুম হেয়ার কাটের অ্যালান বিস্ময়ে বলে উঠে, ওহ্‌ রিয়েলি ?কংগ্রেচুলেশন !

অতঃপর মায়ের হাত ধরে বাঁয়ের রাস্তার দিকে হেঁটে যায় অ্যালান। আমরা মা-ছেলে রেড সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকি। রিহান এবার উচ্চস্বরে বলে উঠে, ” হাই জেফারসন, আমি স্টুডেন্ট অব দ্যা মান্থ হয়েছি “। চায়নিজ জেফারসন ফোকলা দাঁতে একগাল হেসে প্রায় বুঁজে আসা চোখে তাকিয়ে বলে, ” গুড লাক, রিহান “। রাস্তা পেরিয়ে দেখা হলো দু’বছর আগের এক ক্লাস টিচারের সাথে। যথারীতি এবারও রিহান হাই ভিক্টর বলে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে। প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার ভিক্টর কাছে এসে মাথা নুইয়ে বলে, তোমাকে আজ বেশ সুখী লাগছে।

রিহান বেশ গর্বের সাথে চোখ গোলাকৃতি করে বলে, ” ইউ নো হোয়াট, আজই আমি স্টুডেন্ট অব দ্যা মান্থ নির্বাচিত হয়েছি। এভাবে বাড়ি ফেরার পুরোটা পথ সে ইটের দেয়াল, গাছ, পাখি সহ যেন পুরো পৃথিবীকে জানান দিতে থাকে। বাড়ি ফিরে দেখে তাঁর দাদু আচ্ছন্নের মতো চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। তাঁকে জাগিয়ে তোলে। বেডরুমে উঁকি দিয়ে বলে, আব্বুজি, তুমি জানো আজ কি হয়েছে ? রান্নাঘরে গিয়ে আমায় বলে, তুমি হ্যাপি হয়েছো ? ফুপিকে ফোন করবো না ?

আমার মনে হচ্ছিল, এতো আনন্দিত হবার কী আছে ? এ মাসে রিহান হয়েছে, অন্য মাসে অন্যজন হবে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পরক্ষণেই মনে পড়লো বড়ছেলে রিয়াসাত যখন প্রতিবার প্রিন্সিপ্যাল অনারেবল এ্যাওয়ার্ড পেতো, আমরা কতোই না আনন্দিত হতাম। নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেদিন এ্যাওয়ার্ড বিতরন হতো, সেদিন তাঁকে স্যুট-টাই পরিয়ে স্কুলে পাঠাতাম। বাবা-মা হিসেবে আমরা দু’জনই উপস্থিত হতাম আমন্ত্রন পত্র হাতে। সাথে ক্যামেরা নিতে ভুলতাম না। পারলে পুরো অনুষ্ঠানটুকুই ভিডিও করে নিয়ে আসতাম। এ্যাওয়ার্ড আর মেডেলগুলো জমিয়ে রেখেছি সযতেœ। উদ্দেশ্য, একদিন রিয়াসাত বড় হবে, চাকুরিসূত্রে দূরের কোন শহরে থাকবে, তখন অবসরে সেইসব ছুঁয়ে দেখবো। ভীষণ এক নৈঃশব্দ্যের মাঝে স্মৃতিতে ডুবে থাকবো। কিংবা ভেসে থাকবো স্মৃতির অতল অন্ধকারে।

অথচ দ্বিতীয় সন্তানের বেলায় হয়েছে ঠিক তাঁর উলটটা।
চিন্তা ভাবনায় যোজন যোজন ফারাক। ক্লাসে ভালো নাম্বার না পেলেও আমার তেমন ভাবান্তর নেই। এবার ভালো করেনি তো পরের বার করবে। ভালো ফলাফল হলেও উচ্ছ্বাস নেই। যেন এটাই হবার কথা ছিল।

আজ রিহানের সেই কাংখিত এ্যাওয়ার্ড বিতরণী অনুষ্ঠান হলো। আমি তাঁকে অন্যদিনের মতোই ইউনিফর্ম পরিয়ে স্কুলে পাঠিয়েছি। অভিভাবক হিসেবে গিয়েছি একাই। দু’চারটি ছবিও তুলেছি বটে !

নিজের অজান্তেই কী অদ্ভুত এক বৈপরীত্য !

লেখাটি যখন লিখছি, রিহান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বেঘোর এক জগতে। সেই জগতে লাল-নীল, রঙধনুর আলোয় আলোকিত স্কুল অডিটোরিয়ামে স্যুট-টাই পরা ছোট্ট রিহান বাবা-মা’র সাথে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখছে কী ? কে জানে ! সেই মুখের দিকে ব্যাখ্যাতীত এক মায়ায় চেয়ে থাকি আধো অন্ধকারে। একজোড়া মমতার উষ্ণ হাতে, অপরাধী অনুভূতিতে ছুঁয়ে থাকি কপাল। কেননা, আমিও যে ছিলাম দ্বিতীয়জন !

স্টুডেন্ট অব দ্যা মান্থরিমি রুম্মান,নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

পছন্দের আরো পোস্ট