সাহিত্য একাডেমি নিউইয়র্কের ৮৭ তম আসরের কথা

বিকেলের মায়ায় জড়ানো গোধূলি আলো, ভেজা মেঘেদের অবিরত উড়াউড়ি শেষে টুপটাপ ছন্দে ঝরে পড়া, শীতের আধিপত্য কমে বাতাসে ফাগুনের কিছুটা গরম উষ্ণতা, গল্পের মতো এমন একটি আনন্দমুখোর দিনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো সাহিত্য একাডেমির নিয়মিত মাসিক ৮৭-তম আসরটি।

ভাষা দিবসের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জানিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনায় ছিলেন ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক ‘ এর পরিচালক মোশাররফ হোসেন।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি মাস। অনুষ্ঠানের শুরুতেই কবি কাজী আতীক তাঁর আলোচনায় বলেন, ‘ ৫২-এর ভাষা আন্দোলন না হলে ভিনদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ কবিতা পড়ার স্বাধীনতা পেতাম না। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন বিতর্কের দিকে আলোকপাত করে তিনি বলেন, নিজের জানাটাই শেষ নয়। আমরা সবাই যেন সব মাতৃভাষার প্রতি নিজের ভাষার মত একইরকম সম্মান প্রদর্শন করি। ‘

এবারের আসরে নিজেদের মূল্যবান মতামত জানিয়ে আলোচনায় অংশ নেন ফেরদৌস সাজেদীন, ফজলুর রহমান, হাসান ফেরদৌস, হুসনে আরা বেগম প্রমুখ।

কথা সাহিত্যিক ফেরদৌস সাজেদীন অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন,’ সাহিত্য একাডেমির বয়স বাড়ার সাথে সাথে সবার গল্প, কবিতারাও যেন আগের চেয়ে আরো বেশী সমৃদ্ধ হচ্ছে। আমার সামনে বসে আছে একেকটি নক্ষত্র যাঁরা নিজ আলোয় জ্বলজ্বল করছে। লেখার প্রতি সবাই মনোযোগ দিচ্ছেন, নিষ্ঠাবান হচ্ছেন।

আত্মা নিঙড়ানো শব্দ মালায় সজ্জিত ‘ আমার প্রবাস, আমার ভাষা, আমার বিকাশ ‘ একুশের সাথে সম্পৃক্ত নিজ গদ্য পাঠ করে তিনি আলোচনা শেষ করেন। ‘

সাহিত্য একাডেমি নিউইয়র্কনিউইয়র্ক শহর তথা বাংলাদেশের অন্যতম আবৃত্তিকার মুমু আনসারীর দরাজ কন্ঠে ‘সৃজন সেনের’ কবিতা আবৃত্তি আসরে উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। জনপ্রিয় আবৃত্তিকার পারভীন সুলতানা, লুবনা কাইজার, নাসিমা আক্তার, শিরীন বকুল, শুক্লা রায়, পল্লব সরকারের আবৃত্তি পিনপতন নীরবতায় উপভোগ করেন সবাই।

নিজেদের অসাধারণ লেখা গল্প, কবিতা, ছড়া আন্তরিক পাঠে এবারের আসরটি পূর্ণতায় আলোকিত করে রেখেছিলেন, নীরা কাদরী, সোনিয়া কাদির, কামরুন নাহার রীতা, মিশুক সেলিম, শাহীন ইবনে দিলওয়ার, সীমু আফরোজা, পল্লব সরকার, রানু ফেরদৌস, নিলুফার রেজা, নাসরিন চৌধুরী, ফজলুর রহমান, আলম সিদ্দিকী, তাহমিনা সাঈদ, আহমেদ হোসেন বাবু, লিয়াকত আলী, শামসাদ হুসাম, সুরীত বড়ুয়া, পলি শাহীনা, উইলি মুক্তি, রিমি রুম্মান, আবুল বাশার, জাকির হোসেন, রেজাউল হক প্রমুখ।

আসরে উপস্থিত ছিলেন, রাহাত কাজী শিউলি, পপি কুলসুম, ফরিদা ইয়াসমিন, আদনান সৈয়দ, শহীদ উদ্দীন, এ বি এম সালেহ উদ্দীন, কাইজার আহম্মেদ, নিপা জামান, জসীম সরকার, স্বর্ণা, ওবায়দুল্লাহ মামুন, কানু দত্ত, মোঃ নাজমুল হোসেন মিঠু, সঞ্জীবন কুমার, রেজাউল হক প্রমুখ।

সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোঃ ফজলুর রহমান তাঁর আলোচনায় বলেন, ‘ বিদেশী ভাষায় দিনরাত্রি যাপন করেও নিজ দেশীয় ভাষা, সংস্কৃতি চর্চায় ভবিষ্যৎ ইতিহাসে সাহিত্য একাডেমি প্রশংসার দাবীদার। সাহিত্য একাডেমিতে যেভাবে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে প্রবাসে অন্য কোথায়ও এভাবে একাগ্রচিত্তে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে বলে তাঁর জানা নেই। সাহিত্য একাডেমির বয়স যত বাড়বে বিদেশে বাংলা সাহিত্য তত বেশী সমৃদ্ধ হবে। তিনি আরো বলেন, আগে নিজে নিজে সাহিত্য একাডেমিতে আসতাম এখন সাহিত্য একাডেমি নিয়ে আসে। ‘

লেখক হাসান ফেরদৌস বলেন, ‘ বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা বিশ্বের যে কোন ভাষায় রচিত সাহিত্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। সাহিত্য একাডেমির মাধ্যমে প্রতিমাসে একবার হলেও বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান প্রকাশ করা হয়। প্রবাসে নতুন প্রজন্মের বাংলা বলতে না পারার ব্যর্থতার জন্য তিনি পিতামাতাকে দায়ী করেন। ‘

অধ্যাপিকা হুসনে আরা বেগমের মতে, ‘ শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে নয় একুশ যেন প্রতিদিন, সবমাসেই হৃদয়ে অনুরণন তোলে। ১৯৬৯ সালের ১৮-ই ফেব্রুয়ারির গণঅভ্যুত্থানে জীবন দানকারী শিক্ষক ডক্টর জোহাকে স্মরণ করে তিনি বলেন ১৮-ই ফেব্রুয়ারিকে যেন শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ‘

কবি শহীদ কাদরীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবি পত্নী নীরা কাদরী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ সাহিত্য একাডেমির একমাত্র উপদেষ্টা শহীদ কাদরী ডায়ালোসিস থেকে ঘরে ফিরে অসুস্থ অবস্থায়ও ফোন স্পিকারে দিয়ে সাহিত্য একাডেমির খোঁজ খবর নিতেন। শহীদ কাদরীর ‘ বিব্রত সংলাপ’ কবিতাটি পড়ে শুনান নীরা কাদরী। ‘

কবি সোনিয়া কাদির বলেন, ‘ আত্মত্যাগ ছাড়া বড় কিছু হয়না। একুশ আমাদের শিখিয়েছে আত্মত্যাগের শিক্ষা।ব্রংক্সে অনুষ্ঠিত বাফার প্রভাত ফেরীর কথা উল্লেখ করে বলেন, একুশ দেখানোর নয় অনুভবের বিষয়। যে দীক্ষাটি খুব যত্নে প্রবাসে বেড়ে উঠা আগামী প্রজন্মের মাঝে চাষাবাদ করছে বাফা। ‘

লেখক শামসাদ হুসাম বলেন, ‘ প্রবাসে বেড়ে উঠা শিশুদের সাথে পিতামাতারা যেন ঘরে বাংলা ভাষায় কথা বলেন। ‘ সবাইকে আগামী পর্বের আমন্ত্রণ জানিয়ে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি টানেন পরিচালক মোশাররফ হোসেন।

পছন্দের আরো পোস্ট