অঞ্জলি রানী যেন এ যুগের রোকেয়া

তিনি যে গ্রামে জন্মেছেন সেখানে কোন বিদ্যালয় ছিল না। শিক্ষার হার ছিল শূণ্যের কোটায়, মেয়েদের শিক্ষার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারতো না ওখানে। সেই গন্ড গ্রামের প্রথম মেয়ে তিনি, যিনি কিনা স্কুলে যেতে শুরু করেছিলেন। অনেক বাঁধা অতিক্রম করতে হয়েছে তাকে, কিন্তু থেমে যাননি। সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে জয় করেছেন তাঁর অদম্য স্বপ্ন।

‘আমি যখন ক্লাশ ফাইভে পড়তাম। তখনও ভাবতে পারিনি, আমি কোন মাধ্যমিক স্কুলে পড়তে পারবো। কিন্তু এখন আমি একটি সুনামধন্য মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। এ যেন স্বপ্নের চেয়ে বেশি কিছু।’ বলছিলেন খুলনা পাইকগাছা উপজেলার শহীদ জিয়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অঞ্জলি রানী শীল।

অঞ্জলী রানীর জন্ম বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার প্রত্যন্ত কালিকা প্রসাদ গ্রামে। বাবা সুবীর কুমার শীল ছিলেন গ্রামের অবস্থা সম্পন্ন কৃষক। তিন ভাই চার বোনের পরিবারটির বড় মেয়ে তিনি। গ্রামে কোন স্কুল না থাকায়, তিন গ্রাম পাড়ি দিয়ে সাত কিলোমিটার দূরের স্কুলে পড়তে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, তখন পুরো এলাকা সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল। মেয়েরা ইভটিজিংএ শিকার হতো। স্কুলে যাওয়ার পথে ইভটিজিং থেকে বাঁচার জন্য সন্ত্রাসদের মামা বলে ডাকতাম।

মাধ্যমিক পাশ করেছেন বর্ণি ছায়রাবাদ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে। অঞ্জলী রানী ছিলেন তার গ্রামের প্রথম এসএসসি পাশ করা মেয়ে। পরে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন খুলনা বঙ্গবন্ধু কলেজ থেকে। অঞ্জলি রানী যেমন ছিলেন মেধাবী তেমন পরোপকারীও। তিনি বলেন, ‘জীবনে কখনো পাইভেট পড়িনি। তবুও ক্লাসে রুল এক অথবা দুই থাকতো। বাড়ী থেকে প্রাইভেটের টাকা নিয়ে দরিদ্র বান্ধবীর লেখা পড়ার খরচ চালাতাম। ঐ বান্ধবী এখন কলকাতার একটি স্কুলের শিক্ষিকা।’

পরিবারের ভাবনা মেয়ের পড়ালেখা বেশ হয়েছে এবার বিয়ে দিতে, কিন্তু তিনি চাইলেন পড়ালেখা চালিয়ে যেতে। পরে নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারবেন এবং ভাই বোনদের পড়ালেখার দায়িত্ব নিলে স্বামীর আপত্তি থাকবেনা এমন অঙ্গিকারে রাজি হওয়ায় পাইকগাছা উপজেলার এক গ্রাম্য চিকিৎসক কে বিয়ে করেন অঞ্জলি রানী। যোগ দেন শহীদ জিয়া মাধ্যমিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে। জুনিয়র শিক্ষক বলে অন্য শিক্ষকদের কাছে পাত্তা পেতেন না। তাই সিনিয়র শিক্ষক হবেন এমন জিদ থেকে পাইকগাছা কলেজে ডিগ্রীতে পড়ালেখা চালিয়ে যান তিনি। করতে হতো সংসারের কাজও। এই সময় খুব প্ররিশ্রম করতে হতো তাকে। এত কিছু করতেন কিভাবে জানতে চাইলে অঞ্জলী রানী বলেন, খুব ভোরে উঠে ঘরের কাজ শেষ করতাম। মর্নিং স্কুলে ক্লাশ নিতাম সকাল সাতটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত। এরপর করতাম কলেজে নিজের ডিগ্রির ক্লাশ। বিকালে বাসায় এসে তিন ব্যাচে ৮০ জন ছাত্র ছাত্রীকে প্রাইভেট পড়াতাম। তারমধ্যে ২০ জন থেকে টাকা নিলেও ৬০ জনকে পড়াতাম ফ্রি।  তিনি বলেন, স্কুলের বেতন পুরোটা সংসারে দিতাম। প্রাইভেট পড়িয়ে যে টাকা পেতাম, তা ভাই বোনের পড়ালেখার খরচ যোগাতাম।

তিনি খুলনা বিএল কলেজ সম্পন্ন করেছেন বিএড। এমএড করছেন বাউবি থেকে।

অঞ্জলি রানীর প্রচেষ্ঠায় ভাই বোনেরাও আজ সফল। দুই বোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। এক বোন ঢাকার বক্ষব্যধি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত আছেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে একজন রাজধানীর বনফুল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক, একজন অবসর প্রাপ্ত বিডিআর। আরেকজন চাকরী করেন ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রে।

অঞ্জলি রানী দীর্ঘ ২৪ বছর শহীদ জিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ফেব্রুয়ারী ২০১৭ সালে পেয়েছেন প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব। এখনও অঞ্জলি রানী সংসার ও স্কুল নিয়ে কাটান ব্যস্ত সময়। খুব ভোরে উঠে সংসারের কাজ সারেন। স্কুলে এসে অফিসের প্রয়োজনীয় কাজ করেন। রুটিন মাফিক তিনটি ক্লাসের পর দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত দুটি ক্লাস করান। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রীদের খোঁজ খবর নেন। ঝরে পড়াদের ফিরিয়ে আনেন স্কুলে। দরিদ্র ছাত্রীদের ফ্রি পড়ান। নিজের অর্থায়নে পোশাক বই খাতাও কিনে দেন। মেধাবী ছাত্রীদের নিজ উদ্যোগে ক্রেস্ট সম্মাননা দেন। নিয়মিত আয়োজন করেন সৃজনশীল প্রতিযোগিতা, ছাত্রীদের সেরা লেখা দিয়ে প্রকাশ করেন দেয়াল পত্রিকা বেলাভূমি।

নিজের জীবন সম্পর্কে অঞ্জলি রানী বলেন, আমার জীবনকে আমি বৃক্ষের সাথে তুলনা করি। মানুষ বটবৃক্ষের ছায়া নেয় আবার যাওয়ার সময় ডাল ভেঙ্গে নিয়ে যায়। এতে বৃক্ষের কিছু যায় আসে না।’

জীবনে তেমন কিছু চাওয়া নেই তার। তবে ভবিষ্যতে টাকা জমিয়ে নিজ বাড়িতে একটি বৃদ্ধা নিবাস গড়ার স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন তিনি।

//স

পছন্দের আরো পোস্ট