সাকরাইন উৎসবের আমেজ

গতকাল রবিবার গেল পৌষের শেষদিন। এই দিনে প্রতি ববছরের ন্যায় পুরান ঢাকায় পালিত হয়ে গেল সাকরাইন উৎসব। নানান রং আর বাহারের ঘুড়িদের আধিপত্ত চোখে পড়ার মত। আর রাতে থাকছে আলোকসজ্জাসহ বাহারি সব আয়োজন।

উৎসবের এ দিনটি ঘিরে গত এক সপ্তাহ ধরে পুরান ঢাকার বাহান্ন রাস্তা আর তেপান্ন গলির অধিকাংশ গলিতে আর খোলা ছাদে চলছে সুতা মাঞ্জা দেওয়ার ধুম। রোদে সুতা শুকানোর কাজও চলেছিল পুরোদমে। অহরহ কাটা-কাটি খেলায় হেরে যাওয়া অভিমানী ঘুড়ি সুতার বাঁধন ছিড়ে ভাকাট্টা হয়ে যায় দূরে।

জানা যায়, পৌষ মাসের শেষ দিন সাকরাইনে নতুন ধানের চালের পিঠাপুলি খেয়ে, ঘুড়ি উড়িয়ে আনন্দ উৎসব করার রেওয়াজ বহু পুরনো। ঢাকায় এই উৎসব হচ্ছে প্রায় ৪০০ বছর ধরে। ভোরবেলা কুয়াশার আবছায়াতেই ছাদে ছাদে শুরু হয় ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। ছোট বড় সকলের অংশগ্রহনে মুখরিত প্রতিটি ছাদ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়বে উৎসবের জৌলুস। আর শীতের বিকেলে ঘুড়ির কাটা-কাটি খেলায় উত্তাপ ছড়াবে সাকরাইন উৎসব। এক দশক আগেও ছাদে ছাদে থাকতো মাইকের আধিপত্য। বর্তমানে মাইকের স্থান দখল করেছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম।

এদিন পুরনো ঢাকার দয়াগঞ্জ, মুরগীটোলা, কাগজিটোলা, গেন্ডারিয়া, বাংলাবাজার, ধূপখোলা মাঠ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাঁখারী বাজার, সদরঘাট, কোটকাচারী এলাকার অধিবাসীরা সারাদিনব্যাপি রঙ বেরঙের ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগীতায় মেতে উঠেছিলেন। সন্ধ্যায় আগুন নিয়ে খেলা আর আতশবাজি তো থাকবেই।

সাকরাইন উৎসবের দিন সারাদিন আকাশে উড়ানো হয় নানান রঙের, নানান আকারের বিচিত্রদর্শন সব ঘুড়ি। দেখতে যেমন তাদের নামও তেমন বাহারি- গাহেল, চোখদ্বার, মালাদ্বার, পঙ্খীরাজ, চশমাদ্বার, কাউঠাদ্বার, চাপালিশ, চানদ্বার, নাকপান্দার, ভোয়াদার, কাউঠাদার, চিলা, চাপরাস, মাখখি আরও কত কি! এমনকি জাতীয় পতাকার রঙেও তৈরি করা হয় ঘুড়ি। তবে ঘুড়ির চেয়েও সুন্দর হয় এর লেজ। লেজ অনেক আকৃতির ও রঙ বেরঙ এর হয়ে থাকে। ঘুড়ির সঙ্গে সঙ্গে নাটাইগুলোর নামও বেশ মজাদার- বাটিওয়ালা, মুখবান্ধা, মুখছাড়া ইত্যাদি।

সাকরাইন উৎসব নিয়ে কথা বলতে চাইলে শাখারী বাজারের প্রবীন ব্যক্তি উপমান বল বলেন, ‘এই সাকরাইন উৎসব আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন করে আসছি। তখন তো এখনকার মতো আর গান বাজনা ছিল না তবে ছিল অকৃত্রিম আনন্দ আর ভাকাট্ট্রা লোডের আকাশ স্পর্শী শব্দ। এখন আমার নাতি নাতনিরা এ উৎসবে অংশ গ্রহণ করে আগামীতে তাদের উত্তর প্রজন্ম এটা পালন করবে।আরেকটা জিনিস বেশি করতাম যা এখন কমে গেছে আর তা হালো আত্নীয় স্বজনকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো। যা এখন আছে কিন্তু অনেকটাই কমে গেছে। এখন সবাই ব্যস্ত মানুষ বলে।

সাকরাইন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উৎসব হলেও এই উৎসবটি আর আগের মত জানান দিতে পারছেনা নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে তরুণদের মনে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ছোবলে বাংলার প্রাচীন অনেক উৎসবের মতোই সাকরাইও হারাতে বসেছে তার মাধুর্য্য। গুটিয়ে আসছে তার পরিধি। তবে উৎসবের অনুষঙ্গে পরিবর্তন এলেও আমেজ আর আবেগটা এখনও রয়ে গেছে আগের মত।

এডুকেশিন/নিউজ/ওয়া/বির

পছন্দের আরো পোস্ট