দু’চোখের মণিতে শুধু বাংলাদেশের ছবি আঁকি

২০১৪ সালের কথা। জন. এফ. কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে বাবুদের নিয়ে এমিরেটস এয়ারলাইন্সে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ট্রানজিট নিয়ে তখন আমি দুবাই বিমানবন্দরে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বিদেশী এয়ারপোর্টে(দুবাই এয়ারপোর্ট) একসাথে এত বাংগালী দেখে, তাঁদের মুখে বাংলা ভাষা শুনে আমার বড় ছেলে জানতে চাইলো, আম্মু একসাথে এত বাংগালী এখানে কেন? উত্তরে বললাম তাঁরা কাজের সন্ধানে এখানে এসেছে।

দুবাই, আবুধাবি, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া এই দেশগুলোর বিমানবন্দরে আমার বাংলাদেশী ভাই, বোনদের এমন করুণ মানবেতর দৃশ্যগুলোর সাথে আমার পূর্বপরিচয় থাকলেও, আমার সন্তানরা এমন দৃশ্য আগে দেখেনি। ওরা তখন ছোট ছিল, বুঝতে ও ভাবতে শিখেনি। ৬ ঘন্টা দুবাই বিমানবন্দরে অবস্থানকালীন সময়ে ওদের অবুঝ মনের অসংখ্য প্রশ্নের সম্মুক্ষীন হয়েছি আমি বাংলাদেশ এবং বাংগালীদেরকে নিয়ে। ওরা ফ্লোরে শুয়ে আছে কেন? ওদের হাতে প্ল্যাস্টিক ব্যাগ কেন? ওদের এত ক্লান্ত, বিমর্ষ, মনমরা দেখাচ্ছে কেন? এত অল্প বয়সে কেন বিদেশে কাজ করতে এসেছে? ওদের গায়ে ভালো জামা, পায়ে ভালো জুতা নেই কেন? বাবুদের প্রশ্নের যথাসাধ্য উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত আমি দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান শেষে বাংলাদেশের পথে বিমানে উঠে বসলাম।

বিমানে চড়েও আবার তাদের রাজ্যের প্রশ্নবাণে আমি জর্জরিত হতে শুরু করলাম। নিউইয়র্ক থেকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের যে প্লেনে এসেছি তার সিটগুলো অনেক বড়, আরামদায়ক ছিল। খোলামেলা যায়গা ছিল ভিতরে। খাবার, দাবারের মান উন্নত ছিল, বিমানবালাদের মার্জিত ব্যবহার ছিল, কিন্তু একই এয়ারলাইন্সের এই প্লেনে সে ব্যবস্থাগুলো নেই কেন? বাবুদের জন্য যুতসই উত্তর খুঁজে না পেয়ে সোজা বললাম, নিউইয়র্ক থেকে ধনী মানুষেরা এসেছে তাই ভালো ব্যবস্থা ছিল আর এখান থেকে বেশীরভাগ গরীব মানুষগুলো উঠেছে গরীব দেশের উদ্দেশ্যে তাই প্লেনের ভিতরে এমন অসম অবস্থা।

প্লেনের ভিতরে আমার বেশীরভাগ বাংগালী ভাইদের দেখলাম নিজেদের সিট খুঁজে বের করতে পারছেন না, প্লেনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পূরণ করতে পারছেন না, বিমানবালার কথার উত্তর দিতে পারছেন না, তাদের হাতের ব্যাগ কোথায় রাখতে হবে তা জানেন না বলে হলওয়েতে দাঁড়িয়ে থেকে ভীড় সৃষ্টি করেছেন। এসব আমি প্রতিবার-ই দেশে যেতে দেখি আর নিজের সীমাবদ্ধতায় বুকের গভীরের দীর্ঘশ্বাসে জ্বলে, পুড়ে মরি। প্লেনের জানালা দিয়ে অসহায়ের মত শূন্যতার পানে তাকিয়ে থাকি আর সৃষ্টিকর্তাকে বলি, ‘ প্রতিটি জীবনের মূল্য এক নয় কেন? কেন এত অসমতা, বৈপরীত্য?!

আমার জন্ম বাংলাদেশের এক অজপাড়া গ্রামে। সহজ, সরল, প্রাণবন্ত গ্রামের খোলামেলা সবুজ পরিবেশে আমার পড়াশুনা, বেড়ে উঠা। বিদেশে পাড়ি জমানোর আগ পর্যন্ত বেশীরভাগ সময়গুলো আমি গ্রামেই কাটিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের শহুরে পরিবেশ বিশেষ করে ঢাকা শহরের জীবনের সাথে আমি একেবারেই অভ্যস্ত নই। সময়ের পরিক্রমায় বাবা, মা হীন জীবনে এখন দেশে গেলে ভাই, বোনদের সাথে ঢাকাতেই থাকতে হয় আমাকে। গ্রামের বাড়ীতে খুব কম যাওয়া হয়।

ঢাকা শহরের রাস্তায় নামলেই আমার মাথা ব্যথা এবং শ্বাস কস্ট শুরু হয়। ইনহেলারেও স্বস্তি পাইনা, আমি হাঁপাতে থাকি। ঢাকা শহরে থাকাকালীন সময়টা খুব দরকার না হলে ঘরের বাহির হইনা। একদিন দর্জি দোকানের কাজ সেরে বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ অচেনা পর্বতের মত ভারী এক বৃদ্ধের’ মা’ ডাকে আমি থেমে যাই সেখানে। তাকিয়ে দেখি রাস্তার পাশে অপরিষ্কার, ছেঁড়া কাপড় গায়ে এক বয়স্ক লোক গামলায় কিছু ছোট, বড় মাছ আর কয়েক মুঠো লতি নিয়ে বসে আছেন। লোকটির চোখে চোখ রাখতেই তাঁর দু’চোখের গভীর বিলে আমি হাহাকারের স্পষ্ট ঢেউ দেখতে পাই। সে দৃষ্টির গভীরতা সহ্য করতে না পেরে মুহূর্তেই আমি চোখ সরিয়ে নেই। মাটির দিকে তাকিয়ে জানতে চাই দাম কত?! উত্তরে উনি দাম কত বলেছিল তা আজ আর আমার মনে নেই। আমার হাতের মুঠোয় যা টাকা ছিল তা উনার হাতে দিয়ে ভারী বুকে, ঝাপ্সা চোখে বাসায় চলে আসি।

আমি জানি এই লোকগুলো লাভ, ক্ষতির হিসেব কষে কিংবা দালানকোঠা নির্মাণের জন্য, দামী গাড়ী কেনার জন্য রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিছে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকেন না, শুধুই এক বেলার লবণ, ভাত যোগাড় করতে, কুপির কেরোসিন কেনার জন্য এভাবে ঠাই বসে থাকে।

জুলাই, আগষ্ট মাস। দেশে তখন ভরপুর বর্ষাকাল। ঈদুল ফিতর উদযাপনের জন্য সবাই মিলে গ্রামের বাড়ী গিয়েছিলাম। জীবনের বড় বেলায় এসে এখন গ্রামে বেড়াতে গেলে প্রকৃতির মনকাড়া সোন্দর্যের চেয়েও চোখে বেশী পড়ে গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষদের জীবনের অসংগতিগুলো। গ্রামের সহজ, সরল সৎ মানুষগুলো জীবন যাপনের জন্য বেশী কিছু চায় না, চায় শুধু জীবনধারণের নিশ্চয়তা, খুব বেশী অসুস্থ হলে একটু সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসা, মাথা গোঁজবার জন্য যেনতেন একটা আশ্রয়, দু,বেলায় ডাল, ভাত। আকাশচুম্বী কোন স্বপ্ন দেখেনা গ্রামের দরিদ্র মানুষেরা তবুও তাঁদের এই নূন্যতম জীবন যাপনের নিশ্চয়তাও বেশীরভাগক্ষেত্রে তাঁরা পায়না।

নদীর পানিতে বসতভিটা ভেসে যাওয়া চর অঞ্চলের এক ভদ্রলোককে আমার আম্মা বাড়ীতে আশ্রয় দিয়েছেন। উনি আমাদের বাড়ীর এক কোণে ঘর তুলে বউ, বাচ্চা নিয়ে থাকতেন আর জীবিকা নির্বাহের জন্য রিক্সা চালাতেন। ঈদের দিন উনার ঘরে গিয়ে জানলাম তার ঘরে ভাতের চাল নেই, সেমাই নেই, ঈদের নামায পড়তে যাওয়ার জন্য জুতা নেই, টুপি নেই। যদিও তারা আমাদের ঘরেই বেশীরভাগ সময় খায়, থাকে। কথায় আছে, ‘সারা গায়ে ক্ষত ঔষুধ দেব কত। ‘
আমি একজন খেটে খাওয়া গ্রামের সাধারণ মানুষের চিত্র তুলে ধরেছি এখানে, এভাবে অগণিত মানুষের করুণ মানবেতর জীবন ধারণের ইতিহাস আছে গ্রামের সর্বত্র।

আমি প্লেনের ভি.আই.পি সিটে ভ্রমণ করেছি, ঢাকা শহরের গুলশান, বনানীর মত অভিজাত এলাকাগুলোতেও থেকেছি, সোনারগাঁও, রেডিসন চষে বেড়িয়েছি। তারপরেও বলতে পারিনা, ‘ আমি ভাল আছি।’ একলা একা ভালো থাকা যায়না, সুখে থাকাও যায় না। ‘
বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী যখন দারিদ্রসীমার নিছে বসবাস করেন তখন হাতে গোণা কিছু মানুষের অভিজাত জীবন যাপন আর চোখে পড়েনা, মনে সুখ দেয়না। একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে রাতদিন শুধু আত্মদহণে পুড়ি।

বাংলাদেশে ভালো মানুষের সংখ্যা কম নয়। শুধু দরকার রাষ্ট্রীয়, সামাজিক উদ্যোগ। মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ দেশের প্রভাবশালী মানুষগুলো যদি সবাই যার যার নিজস্ব অবস্থান থেকে গ্রাম, শহর তথা পুরো দেশের শ্রমজীবী মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ায় তাহলেই দেশের দরিদ্র মানুষদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়ে যাবে অচিরেই।

স্বপ্ন দেখি, একদিন আমার জননীসম বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে স্বমহিমায়, সম্মানের সাথে নিজের জায়গা করে নিবে।

জীবিকার তাগিদে যেখানে, যেদেশেই থাকি,
দু’চোখের মণিতে শুধু বাংলাদেশের ছবি আঁকি।

পলি শাহীনা। নিউইয়র্ক।

পছন্দের আরো পোস্ট