গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের হালচাল

জ্ঞান চর্চার অন্যতম উপকরণ বই, পত্রিকা, সাময়িকী ইত্যাদির সংরক্ষণের কেন্দ্র হচ্ছে গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগার শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত নয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন বিভিন্ন অফিস, আদালত, গবেষণা কেন্দ্র, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, দপ্তর, পরিদপ্তর, এনজিও, ল’ ফার্মসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে গ্রন্থাগার বিবেচিত। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হলো তথ্য সম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিতরণ ও তথ্য সেবা দানের মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য মৌল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহযোগীতা করা।

পৃথিবীর সর্বত্রই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে গ্রন্থাগার। বর্তমানে সকল সরকারি-বেসরকারি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, উন্নয়নধর্মী প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ”কুদরত এ খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট” এবং পূর্বাপর অন্যান্য শিক্ষা কমিশন রিপোর্টও গ্রন্থাগারকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হৃদপিন্ডের সাথে তুলনা করেছে। শিক্ষার গুনগত মান সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গ্রন্থাগারের বিকল্প নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারিকগণ শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শিক্ষকদের শিক্ষাগ্রহণ কার্যক্রমে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন । একারণেই বিশ্বের সর্বত্র গ্রন্থাগার পেশাজীবীদেরকে শিক্ষকের পর্যায়ভূক্ত বলে মনে করা হয়। এমনকি উন্নতদেশে গ্রন্থাগারিকদের শিক্ষকের শিক্ষক হিসেবেও অভিহিত করা হয় ।

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা/কর্মচারী প্রত্যেককেই চাকুরীতে প্রবেশের পর অনেক পড়াশোনা করতে হয়। প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক ও চৌকস কর্মকর্তা হতে গেলে থাকতে হয় বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানসমৃদ্ধ। প্রতিনিয়তই আধুনিক তথ্য সমৃদ্ধ বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে হয় নিজেকে। সমৃদ্ধ হতে হয় নতুন নতুন তথ্যে। আবার পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হয় তাকে। দক্ষতার সাথে দাফতরিক কাজ পরিচালনার জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয় সবসময় । আর এ জন্য তাকে দাড়স্থ হতে হয় জ্ঞান ও তথ্য সেবার মূল কেন্দ্র গ্রন্থাগারের। নিয়মিত ব্যবহার করতে হয় গ্রন্থাগার, নিতে হয় গ্রন্থাগারিকের সহযোগীতা। তদ্রুপ একজন ভাল শিক্ষক, বিদ্যান, গবেষক, পন্ডিত, ডাক্তার, আইনজীবী হতে চাই ভাল বই, জার্নাল, রিপোর্ট, পত্রিকা ইত্যাদি। এ জন্য ব্যবহার করতে হয় গ্রন্থাগার এবং নিতে হয় গ্রন্থাগারিকের সহযোগীতা।
এভাবেই গ্রন্থাগারিকগণ স্কুলে পাঠদান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে উপাচার্য, মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারক ’সচিব/জেষ্ঠ সচিব’, বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে আসীন হবার ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারিকগণ নিরলসভাবে নীরবে-নিভৃতে তথ্যসেবা প্রদান করেন। শিখরে পৌঁছাতে শেকড়ের ভূমিকায় কাজ করেন তারা।

বাংলাদেশ সামাজিক, অর্থনৈতিক, যোগাযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন সকল সূচকে প্রতিনিয়তই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি পরিচালনার জন্য সৃষ্টি করা হচ্ছে নতুন নতুন পদ। উম্মুক্ত করা হচ্ছে পদোন্নতির ব্যবস্থা। ধারাবাহিকভাবে দেয়া হচ্ছে পদোন্নতিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু গ্রন্থাগার পেশার সাথে জড়িত পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে ঠিক এর বিপরীত। যা খুবই কঠিন, নির্মম, নিষ্ঠুর ও অপমানজনক। সম্ভাবত: মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, পরিদপÍরের (গণগ্রন্থাগার ও বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রন্থাগার ব্যতীত) শুধুমাত্র গ্রন্থাগারিকগণ ও মসজিদের ইমামদের কোন পদোন্নতির ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/অধিদপ্তরের গ্রন্থাগারিকদের ভিন্ন ভিন্ন নিয়োগবিধি, বেতনস্কেল বিদ্যমান। নিয়োগ বিধি না থাকায় অনেকেই সেলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেলও পাচ্ছেন না। এ যেন উদ্ভট উটের পিঠে চলছে মন্ত্রণালয়ের গ্রন্থাগারিকগণ।

আরও করুণদশা স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় নিয়োজিত গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত/শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের গভর্নিং বডি (সংশোধিত) সংবিধি ২০১৫ এর অনুচ্ছেদ ২ (ছ) এ বলা হয়েছে কলেজের নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন গ্রন্থাগারিক, প্রদর্শক, ও শরীরচর্চা শিক্ষক কলেজের শিক্ষক হিসেবে গণ্য হইবেন। সরকারি নীতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও কার্যক্ষেত্রে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত ০৮.০১.২০১৩ তারিখে জারিকৃত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা) এর ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের চাকুরী বিধিমালা ২০১২ (পরিশিষ্ট – ৩) এর অনুচ্ছেদ ২(ছ) তে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের সহকারি গ্রন্থাগারিকদের ননটিচিং স্টাফ অর্থাৎ তয় শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে গণ্য করে পরিপত্র জারি করা হয়। যা খুবই দুঃখজনক। সহকারি গ্রন্থাগারিকগণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের পর্যায়ভূক্ত নন, বরং তারা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে জড়িত বিধায় বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতির প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং -শিম/শা-১৩/বিবিধ-১/চাকুরি বিধিমালা/২০১২/১৪৪ তারিখ ০৫.০৫.২০১৩ এর মাধ্যমে সহকারি গ্রন্থাগারিকদের উক্ত পরিপত্র হতে প্রত্যাহার করে এক সংশোধনী আদেশ জারি করা হয়। যা ছিল সুভংকরের ফাঁকি। কারণ উক্ত সংশোধনী আদেশে সহকারি গ্রন্থাগারিকদের ননটিচিং তয় ও ৪র্থং শ্রেণীর স্টাফ থেকে প্রত্যাহার করা হলেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোন স্পষ্টিকরণ ছিল না। ফলে সর্বত্র এক ধরনের বিভ্রান্তি বিরাজ করতে থাকে। বিষয়টি স্পষ্টিকরণসহ টিচিং স্টাফ হিসেবে গণ্য করে পুনরায় একটি সংশোধিত পরিপত্র জারি করার জন্য বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বার বার অনুরোধ করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রী, শিক্ষা সচিবসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বোতন কর্মকর্তাগণ একাধিকবার মৌখিক আশ্বাস প্রদান করলেও বিষয়টির কোন সুরহা হয়নি। বরং ”গ্রন্থাগারিক, সহকারি গ্রন্থাগারিক এবং অফিস ব্যবস্থাপনার জন্য বা খ-কালীন শিক্ষাদানের জন্য নিযুক্ত কোন ব্যক্তি শিক্ষক হিসেবে গণ্য হইবেন না” এই মর্মে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক ১ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে একটি পরিপত্র জারি করে। এ যেন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সহকারি গ্রন্থাগারিকদের জন্য মরার উপর খড়ার ঘা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধিতে কলেজের গ্রন্থাগারিকদের শিক্ষকের মর্যাদা দেয়া হয়েছে অথচ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এহেন বিপরীতমুখী পরিপত্র প্রকাশ- যা সহকারি গ্রন্থাগারিকদের জন্য এক ধরনের বিমাতাসুলভ আচরন। এ সুযোগে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের গ্রন্থাগার সেবা প্রদানের পরিবর্তে অন্যান্য কাজের দায়িত্ব দিচ্ছেন। গ্রন্থাগার কর্মীরা অনেক সময় কর্তৃপক্ষের রুঢ় আচরনের স্বীকার হচ্ছেন। ফলে তাদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম হতাশা। এভাবেই চলছে বাংলাদেশের গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের জীবন ।

কিন্তু এ সংক্রান্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উচ্চ আদালতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কলেজ এবং সরকারি সহায়তাপুষ্ট কলেজসমূহে লাইব্রেরিয়ান/সহকারি লাইব্রেরিয়ান/ডেপুটি লাইব্রেরিয়ানদের টিচিং স্টাফ হিসেবে গণ্য করে শিক্ষকদের সমান সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অনুরূপ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের উপযুক্ত পদমর্যাদা ও পদোন্নতির ব্যবস্থা নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষ পুনরায় পরিপত্র জারি করবেন এই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/অধিদপ্তরে বিভিন্ন নিয়োগ বিধিমালার আওতায় নিয়োগপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিকদের ব্লক পদ থেকে পদোন্নতির ব্যবস্থা গ্রহণ করে একটি সমন্বিত বিধিমালা প্রণয়ন করে অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো স¦াভাবিক কার্যক্রমে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরী। প্রয়োজনে ক্যাডার সার্ভিসের আওতাভূক্ত করে নতুন নতুন দক্ষ গ্রন্থাগার ও তথ্যকর্মী সৃষ্টি করা যেতে পারে। গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগারিকের মান উন্নয়ন করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে তাদের ইতিবাচক ভূমিকা ও অবদান রাখার সুযোগ তৈরী করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন ।

  • মো. অহিদুজ্জামান লিটন, কলাম লেখক ও যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি।
পছন্দের আরো পোস্ট