মাতৃভাষা চর্চায় ধর্মীয় প্রেরণা

পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র ভাষা, যার মর্যাদা আদায়ের জন্য মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। দুনিয়ার ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। অতএব মাতৃভাষাকে রূপে-গুণে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বিশুদ্ধভাবে ভাষা ব্যবহার করাসহ সব স্তরে বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বিশ্বখ্যাত ও মূল্যবান গ্রন্থগুলো মাতৃভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করারও ব্যবস্থা নিতে হবে। বস্তুত ভাষা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার নিদর্শনরাজির অন্যতম। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে হলো আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা।’ (সূরা রুম : ২২)। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশের ভঙ্গি।’ (সূরা আর রাহমান : ৩-৪)। মাতৃভাষা চর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করে এরশাদ হয়েছে, ‘আমি রাসুলদের স্বজাতির ভাষা দিয়েই প্রেরণ করেছি, যেন তারা আপন জাতিকে সুষ্ঠুভাবে বোঝাতে পারেন।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪)।

আর দ্বীনি দাওয়াতের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার সঙ্গে বিশুদ্ধভাষী হওয়াও জরুরি। হজরত মুসা (আ.) এর মুখে জড়তা ছিল। হারুন (আ.) তার চেয়ে অধিক বিশুদ্ধভাষী ছিলেন। তাই মুসা (আ.) আল্লাহ তায়ালার কাছে আবেদন করেছিলেন, ‘আর আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে অধিক বিশুদ্ধভাষী, সুতরাং তাকে আমার সাহায্যকারীরূপে আমার সঙ্গে নবুয়ত দান করুন। সে আমাকে সত্য প্রতিপন্ন করবে। আমি আশঙ্কা করি তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে সাব্যস্ত করবে।’ (সূরা আল কাসাস : ৩৪)।
আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের হেদায়েতের জন্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল কোরআনুল কারিম, তা হচ্ছে আরবি ভাষার সর্বাধিক বিশুদ্ধ রূপ। স্বয়ং নবীজিও ছিলেন সবচেয়ে বিশুদ্ধ আরবিভাষী। দৈনন্দিন জীবনেও তিনি বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। ভাষা ব্যবহারে তিনি অশুদ্ধতা ও আঞ্চলিকতা এড়িয়ে চলতেন সর্বদা। এই যে দেখুন, তার কাছ থেকে হাজারও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসগুলো আমাদের পর্যন্ত হুবহু পৌঁছেছে। হাদিসগ্রন্থাদি আমাদের সামনেই আছে। এগুলো তো আর কেউ সম্পাদনা করে সংকলন করেনি। অথচ বিশুদ্ধতার মানদ-ে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে এসব হাদিস সবার ওপরে। বরং হাদিস গবেষকরা কোনো হাদিস মাওজু বা জাল ও বানোয়াট কিনা পরিচয়ের ক্ষেত্রে একটা নীতিনির্ধারণ করেছেন যে, কথাটিতে কোনো অশুদ্ধ… শব্দ থাকলে সেটা মাওজু ও জাল বলে পরিগণিত হবে। সম্ভবত এসব দিক বিবেচনায় ওলামায়ে কেরাম বলেন, নিজ ভাষায়ও বিশুদ্ধ কথা বলা সুন্নত। নবীজি শুদ্ধভাষায় কথা বলতেন, এজন্য আমিও বলব, এমন নিয়ত থাকলে অবশ্যই তা সওয়াব হাসিলের মাধ্যম হবে।

আরও দেখুন, আরবি ভাষা আরবদের জন্য যেমন দ্বীনি ভাষা তেমনি তা তাদের মাতৃভাষাও বটে। সাহাবায়ে কেরাম এ ভাষায় শুধু জিকির-আজকার করতেন, কোরআন তেলাওয়াত করতেন এমন নয়, তাদের দৈনন্দিন কজকর্মও এ ভাষায় সম্পন্ন হতো। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তাদের শব্দচয়নেও সতর্কতা অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এক প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “হে মোমিনরা, তোমরা ‘রায়িনা’ বলো না, ‘উনজুরনা’ বলো এবং শুনতে থাক।’ (সূরা বাকারা : ১০৪)।

হাদিসেও আমরা দেখি, সাহাবিদের দৈনন্দিন কাজকর্মেও রাসুলুল্লাহ (সা.) ভাষার বিশুদ্ধতা, উপযুক্ত শব্দচয়ন ইত্যাদির প্রতি তাগিদ করেছেন। একবার এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এলেন। তিনি বাইরে থেকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আ-আলিজু?’ ঢোকা অর্থে এ শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় আছে, কিন্তু অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে তা প্রমিত শব্দ নয়। প্রমিত শব্দ হচ্ছে, ‘আ-আদখুলু?’ তো নবীজি (সা.) বললেন, “তুমি ‘আ-আদখুলু?’ বলো।” (সুনানে আবু দাউদ : ৫১৭৭)। নবীজি এভাবে তার শব্দ প্রয়োগ ঠিক করেছেন। অথচ তা জিকির-আজকার বা এ জাতীয় কোনো বিষয় ছিল না। সহিহ মুসলিমে তো একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ই আছে ‘কিতাবুল আলফাজ’ শিরোনামে। সেখানে বিভিন্ন হাদিসে নবীজি (সা.) শব্দপ্রয়োগ সংশোধন করেছেন। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি এরশাদ করেন, “তোমরা এশার নামাজকে ‘আতামা’ বলো না, ‘এশা’ বলো।” (মুসলিম : ৬৪৪)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি এরশাদ করেন, “আঙুরকে তোমরা ‘করম’ বলো না, ‘ইনাব’ বলো।” (মুসলিম : ২২৪৭)।

মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বায় ‘কিতাবুল আদব’-এর একটি শিরোনাম হলো, ‘মান কানা ইউয়াল্লিমুহুম ওয়াদরিবুহুম আলাল লাহনি।’ অর্থাৎ সন্তানকে ভাষা শিক্ষা দেয়া এবং ভুল হলে শাসন করা প্রসঙ্গ। এ পরিচ্ছেদে সহিহ সনদে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, কথাবার্তায় লাহ?ন বা ভাষাগত ভুল হলে তিনি সন্তানদের শাসন করতেন (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ২৬১৪৮ এবং তৎপরবর্তী বর্ণনাগুলো)। বোখারি (রা.) এর আল আদবুল মুফরাদেও এ বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে। (বোখারি : ৮৭৬)। তদরূপ ওমর (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকেও অনুরূপ বিষয় ‘তাজকিরাতুল হুফফাজ’ প্রভৃতি গ্রন্থে বিবৃত হয়েছে।

তাছাড়া আল্লামা ইয়াকুত হামাওয়ি (রা.) তদীয় ‘মুজামুল উদাবা’ গ্রন্থে সাহাবা যুগ পরবর্তী সময়েও সালাফে সালিহিনের এমন অনেক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। ইমাম আহমাদ (রা.) স্বীয় আদরের মেয়েকে বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষাদানের প্রতি বেশ গুরুত্ব দিতেন। ভুল উচ্চারণ করলে তিনি শাসনও করতেন।

এসব থেকে বোঝা যায়, দৈনন্দিন জীবনেও একজন মোমিনের ভাষা বিশুদ্ধ ও শালীন হতে হবে। এটা দ্বীনি ভাষার প্রসঙ্গ নয়, মাতৃভাষার প্রসঙ্গ। অতএব মাতৃভাষা যাই হোক তার বিশুদ্ধতা শরিয়তের কাম্য। সর্বোপরি যে কোনো ভাষায় কথা বলার সময় কোরআনে কারিমের এ বাণীটি স্মরণে থাকা চাই, ‘হে মোমিনরা! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করবেন। যে কেউ যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’ (সূরা আল আহজাব : ৭০-৭১)। (সূত্র-আলোকিত বাংলাদেশ)।

লেখক : লন্ডনপ্রবাসী আলেম

পছন্দের আরো পোস্ট