যেমন চলছে গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ

his_uniগত (৪ ডিসেম্বর) রবিবার বেলা বারোটা। সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ। কিছুক্ষণ আগেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাইশ মাইল নামক স্থানে সড়ক দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মো. সবুজ মিয়া। শিক্ষানবিস চিকিৎসকদের ধারনা তার ‘ক্ল্যাভিকল’ নামক হাড় ভেঙ্গেছে। জরুরি ভিত্তিতে এক্স-রে করা দরকার। কিন্তু গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই হাসপাতালের একমাত্র এনালগ এক্স-রে যন্ত্রটি গত দশদিন ধরে অকেজো থাকায় তাকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়।

বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের শর্ত অনুযায়ী প্রতিটি মেডিকেল কলেজের একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ সর্বোচ্চ সেবা প্রদানকারী আধুনিক হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে উঠা গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নূন্যতম জরুরি সেবা ব্যবস্থাটুকুও নেই। অপ্রতুল রোগ নির্ণয় ব্যাবস্থা, একটি রুমে দু-তিন ব্যাচের ক্লাস নেওয়া সহ হাজার সমস্যায় জর্জরিত গরিবের জন্য চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের মূলমন্ত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সাভারের এই হাসপাতাল। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অধীনে মোট ছয়টি একাডেমিক হাসপাতাল ভবন থাকলেও সাভার এবং ধানমন্ডির হাসপাতালে মূলত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষানবিস চিকিৎসক জানান, সপ্তাহে ২-৩ দিনে আসেন এমন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদেরও প্রায় প্রতি মাসে হেলথ্ ক্যাম্পের জন্য পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এবং ঐসময়ে হাসপাতাল পরিচালিত হয় শুরুমাত্র শিক্ষানবিস চিকিৎসক দ্বারা। ফলে ভোগান্তির শিকার হন স্থানীয় সহ দূর থেকে আসা রোগীরা। এছাড়া শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাসের জন্য রয়েছে একটি মাত্র ক্লাস রুম। যা গাইনি ওয়ার্ড থেকে ল্যাবে যাওয়ার রাস্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের রোগ নির্ণায়ক প্রায় সব পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে লেখা হয়। মেডিকেল কলেজ হওয়া সত্ত্বেও এইসকল রিপোর্টে স্বাক্ষর করেন ল্যাব টেকনিশিয়ানরা। ১৫০ বেডের এই হাসপাতালের একমাত্র এনালগ এক্স-রে যন্ত্রটি গত দশদিন ধরে অকেজো। জরুরি ভিত্তিতে এক্স-রে করানোর ব্যবস্থা জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আশরাফ উদ্দিন মল্লিক অন্য কোন হাসপাতাল থেকে এক্স-রে করাতে বলেন। কবে ঠিক হবে তার কোনো নির্দিষ্ট  উত্তরও তিনি দিতে পারেননি।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে এবং ধানমন্ডিতে অবস্থিত অপর হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকার মধ্যে ছয় তলার ‘নগর হাসপাতাল’ নামেই পরিচিত এই হাসপাতালে কোনো জরুরি বিভাগ নেই। নিচ তলার দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা জুড়েই রয়েছে ফিজিওথেরোপী বিভাগ।

দ্বিতীয় তলায় অন্ধকারছন্ন গাইনি ওয়ার্ডের সাথে আকুপাংচার ও আয়ুর্বেদ। তৃতীয় তলায় একসাথে সার্জারি ও মেডিসিন ওয়ার্ড। চার ও পাঁচ তলায় চলছে নতুন ডায়ালাইসিস সেন্টার চালুর কাজ। সর্বশেষে ছয় তলায় রয়েছে টেবিল, সাউন্ড সিস্টেম ছাড়া ডেকোরেশনের চেয়ার দিয়ে তৈরী করা একটি ক্লাস রুম। মাইক্রোফোন ছাড়া শুধু চেয়ারে বসে প্রতি ব্যাচের ১১০ এর অধিক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর এইখানে ক্লাস করে যাচ্ছে।

এমবিবিএস শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে দুইদিন সাভার থেকে এসে এই হাসপাতালে ক্লাস করে। এই দুদিনের জন্য কর্তৃপক্ষের নেই কোনো ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। তাই সকাল সাতটার ক্লাসের জন্য খুবভোরে সাভার থেকে পাবলিক বাসে রওনা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। হাসপাতালে ছেলে মেয়েদের জন্য নেই কোনো আলাদা বাথরুম। ফলে পুরুষ ও মহিলা রোগী এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতে হয় একই বাথরুম।

শিশু বিভাগে নেই কোনো ইনকিউবেটর। ফলে একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নূন্যতম সেবাটুকু পায়না ক্রিটিকাল অবস্থা নিয়ে জন্ম নেওয়া কোনো নবজাতক। অপারেশন থিয়েটার গুলো যেন মাছি পালনখানা। নেই কোনো অপারেশন পরবর্তী জরুরি চিকিৎসা কক্ষ। নূন্যতম জীবাণু মুক্ত না থাকার কারণে সব সময়ই অপারেশনের রোগীরা এই হাসপাতালে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালের ফার্মেসী গুলোতে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি ঔষধ ছাড়া অন্য কোনো ঔষধ পাওয়া যায়না। যদি গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসে কোনো ঔষধের উৎপাদন বন্ধ হয়ে থাকে, তাহলে ঐ ঔষধ বাহির থেকে আনার ব্যবস্থা করা হয় না। আবার জরুরি সময়ে থাকেনা সব ঔষধ। ফলে হাসপাতালের রোগীদের ঔষধের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

এতো এতো সমস্যায় জর্জরিত এই মেডিকেল কলেজ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬টি ব্যাচের হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাস করে বের হয়েছে। সাথে শিক্ষক সংকট, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা বছরের পর বছর চললেও ভ্রুক্ষেপ নেই কর্তৃপক্ষের। এমতাবস্থায় এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেরদের শিক্ষার মান এবং ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সন্দিহান।

 

পছন্দের আরো পোস্ট