রেজাল্ট ভালো পেতে সন্তানের প্রতি বন্ধুসুলভ হোন

11822813_912064152196968_216252526330039257_nরিয়াসাত এবং সাহান নিউইয়র্কের এলিমেন্টারি (প্রাইমারী) স্কুলে ক্লাসমেট ছিল। দু’জনার মাঝে প্রতিযোগিতা ছিল বেশ। লেখাপড়ায় সাহান এগিয়ে ছিল অনেকটাই। পরীক্ষায় নাম্বার কম পেলে রিয়াসাত মনখারাপ করে থাকতো। বাড়ি ফেরার সময় অর্ধেকটা পথ অশ্রু জলে ভাসতো। আর আমি তাঁকে বুঝাতাম, নিশ্চয়ই পরেরবার তুমি ভাল করবে, যা নাম্বার পেয়েছ, তাতে আমি অনেক খুশি…। অতঃপর আমি তাঁকে হাসির গল্প বলতাম, অদ্ভুত সব অভিনয় করে দেখাতাম, এবং আমরা মা-ছেলে হাসতে হাসতে বাকিটুকু পথ বাড়ি ফিরতাম।

সেই সময়ে পড়াশোনার নিয়মিত অংশ হিসেবে লাইব্রেরী থেকে বই এনে রিয়াসাতকে নেচে, গেয়ে, অভিনয় করে পড়ে শুনাই। সে খিলখিল করে হাসে। কম্পিউটারে ম্যাথ নিয়ে বসি। কুইজ খেলি। তাঁর সাথে আমিও যেন আরেকজন সমবয়সী শিশু। দু’জনে মিলে পড়া পড়া খেলায় মেতে উঠি। থার্ড গ্রেড থেকে রিয়াসাত ভালো ফলাফল করতে শুরু করে। স্কুল ছুটি শেষে আমরা মায়েরা বাচ্চাদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। যেন নীরব জিজ্ঞাসা “আজ কেমন নাম্বার পেয়েছ ?” । ওরাও যেন চোখের ভাষা বুঝে নিয়েছে। এসেই বলতে থাকে।

সাহান যেদিন ভাল নাম্বার পায়না, সেদিন ওর মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা একদিকে খিঁচুনির মত করে নাড়তে থাকে থেমে থেমে। বিষয়টি ওর মা-ই আমাকে দেখায় একদিন। ভয়ে, আতংকে নাকি এমনটি করে। এরপর থেকে মনের অজান্তেই সবসময় সেদিকে মনোযোগ চলে যেতো। দেখতাম, আসলেই তো !

সকালে এবং স্কুল ছুটির সময়ে সাহান এর মা এবং আমি স্কুল গেটে যখন গল্প করি, তখন বুঝতে পারি যে তিনি ভীষণ কড়া এবং রাগী মা। নিজেই জানালেন, ছেলে ভাল রেজাল্ট না করলে কন্‌কনে শীতের দিনেও তাঁকে বাড়ির বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন এক ঘণ্টা। আর বলেন, “এটা তোমার পানিশমেন্ট”। শাস্তিস্বরূপ আরো কি কি করেন, শুনে আমি বিস্ময়ে চেয়ে থাকি। বলি, “এমনটি করবেন না।এতে ভালোর চেয়ে খারাপই হবে বেশি।”

মাঝে মাঝে স্কুল ছুটির সময়ে সাহানের মা’কে দেখি না। রিয়াসাতকে জিজ্ঞেস করে শুনি সেদিন সাহান স্কুলে আসেনি। ফোন করি। ভাবি, অসুখ বিসুখ হোল কিনা ! ওর মা জানায়, সাহানের সাইকোলজিস্ট এর সাথে রুটিন এপয়েনমেন্ট ছিল। আমি একটু অবাক হই। নিজেই বললেন, ডাক্তার প্রতিবারই মা এবং ছেলের সাথে আলাদাভাবে একাকি কথা বলেন। সাহানের মা’কে একাধিকবার সতর্ক করে দিয়েছেন এই বলে যে, “তুমি ছেলে চাও, নাকি রেজাল্ট ? যদি ছেলে চাও, তাঁকে তাঁর মত করে থাকতে দাও, আচরনে নমনীয় এবং বন্ধুসুলভ হও”। কিন্তু তিনি কিছুতেই এটি মানতে নারাজ। ছেলেকে যে ভাল রেজাল্ট করতেই হবে, যে কোন ভাবেই হোক।

এখন সাহান এবং রিয়াসাত দূরের মিডল স্কুলে অষ্টম গ্রেডে পড়ে। একাকি পাবলিক বাসে স্কুলে যায়। নিজেদের পড়া নিজেরাই বুঝে। আমায় আর নেচে, গেয়ে, অভিনয় করে পড়াতে হয় না। দিনভর গেইম খেলা রিয়াসাত কেমন করে ভাল রেজাল্ট করে, অনারেবল এ্যাওয়ার্ড পায়, স্টুডেন্ট অফ দ্যা মান্থ হয় বুঝি না। এদিকে ছোটবেলায় এগিয়ে থাকা সাহান মোটামুটি রেজাল্ট নিয়ে পিছিয়ে আছে। আমাদের মায়েদেরও আর দেখা হয় না, গল্প হয় না। মাঝে মধ্যে ফোনে কথা হয় অল্পবিস্তর। যেহেতু আসছে অক্টোবরে ওদের পরীক্ষা, তাই পড়াশোনা, প্রস্তুতি এসব জানার জন্যে ফোন দেই। জানলাম, ইদানিং সাহান তাঁর মাকে এড়িয়ে চলে, দূরে দূরে থাকে, প্রচুর মিথ্যে বলে, মিথ্যে ধরিয়ে দিলে কিংবা জেরা করলে বলে, “সত্য বললে তো তুমি চিৎকার চেঁচামেচি করবে, তাই মিথ্যে বলি”। আমি চম্‌কে উঠি। যে ছেলেটি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতো না ভয়ে, সে ক্যামন করে এমন হোল !

ফোন রাখার আগে সাহানের মা ছোট্ট শ্বাস নিয়ে আক্ষেপের স্বরে বললেন, “ওরে আমার দুই চক্ষে দেখতে ইচ্ছা করে না, কি আর করবো জীবনে, ম্যাকডোনাল্ডসে কামলা দিবো আর কি “।

ফোন কেটে দেয়ার শব্দ কানে এলো। চুপটি করে বসে থাকি ব্যালকনিতে। সাহানের মত আমার চেনা আরও কয়েকজনের কথা মনে পড়ে গেল। যারা তাঁদের কিশোরমনে তীব্র ঘৃণা লালন করে নিজ নিজ বাবা-মায়ের প্রতি। বাবা-মায়ের সাথে হাসি, আনন্দে মেতে থাকা কোন শৈশব স্মৃতি নেই তাঁদের। আছে শুধু শাসনের নামে নরক যন্ত্রণার এক শৈশব, কৈশোর।

এ পর্যন্ত লেখার পর আমার ছয় বছরের ছেলে রিহান বিস্কিট খেতে খেতে সামনে এলো।
আমি বলি, ” রিহান, ভাল করে চাবায়ে খাও”।
জবাবে সে বলল, “আমি বালো করে চাবা করি তো ”
ভাল থাকুক আমাদের সন্তানেরা। ভাল থাকুন সকলে।

পছন্দের আরো পোস্ট