ছিটমহল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার গল্প

ধরুন বাংলাদেশের এমন এক অঞ্চলে আপনার বাস যেখানকার চারপাশ জুড়ে অন্য রাষ্ট্রের ভূখন্ড। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আপনি মাতৃভূমির মূল ভূখন্ডে আসতে পারেন। আপনার বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, হাতের কাছে নেই চিকিৎসা ব্যবস্থা। ভালো বিদ্যালয় নেই, নেই কোন কলেজও। প্রতিদিন ২২ কিলোমিটার রাস্তা সাইকেলে চেপে কলেজে যাওয়া আসা করতে হয়। তার উপর সংসারে নানা অভাব। বলুন তো এই অবস্থায় আপনার পক্ষে কতটা সাফল্য অর্জন সম্ভব ?

 

হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। আর এই কঠিন কাজটিই করে দেখিয়েছেন রেজাউল ইসলাম প্রামানিক , ডাকনাম রতন। জন্ম কবে জানেননা তিনি। তবে নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করার সময় শিক্ষকরা তার জন্ম ১৯৯৫ সাল লিখে দেন। এটাই তার লিখিত জন্ম তারিখ। বাবা-মা নিজের নাম লেখা তো দূরের কথা , এক-দুই-তিন করে ৫০-এর বেশি গুনতেও জানেন না কেউ। ছিটমহল থেকে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী রেজাউল ইসলাম।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি যুদ্ধে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে নিজের জায়গা নিশ্চিত করেছেন তিনি। আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে মেধার স্বাক্ষর রাখতেহয়েছে। ‘দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা’ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা প্রথম ছাত্র। অভাবের মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে লালমনিরহাট জেলা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পেরে নিজেকে অনেক গর্বিত মনে করেন।

 

২০০৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভকরেন। আর এই সাফল্যই রেজাউলের জীবনের স্বপ্নের বৃত্তকে বড় করে দেয় বলে তিনি জানান। সদা হাস্যেজ্জ্বল এই তরুণ জানান, লালমনিরহাটে বৃত্তিপ্রাপ্তদের সংবর্ধনায় উপস্থিত হয়ে তিনি প্রথম ধারণা পান বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে। সেই থেকে স্বপ্ন দেখা শুরু।

 

Post MIddle

বাবা-মায়ের পক্ষে রাতে দীর্ঘ সময় বাতি জ্বালানোর মত কেরোসিনের ব্যবস্থা করা কষ্টসাধ্য হওয়ায় দিনের আলোতেই পড়তে হতো তাকে । পড়াশোনার বেশিচাপ থাকলে কুপির আলোয় পড়ার জন্য বন্ধুর বাড়ি চলে যেতেন। আর ছুটির দিনগুলোতে সারাদিন মাঠে কাজ করতে হত একটু বাড়তি আয়ের জন্য অথবা পরিবারের একটু আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য।

 

২০১০ সালে দহগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন। পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ইতিহাসে সর্বোচ্চ জিপিএ ৪.৯৪ পয়েন্ট পেয়ে রেকর্ড গড়েন। ভর্তি হনবাড়ি থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের পাটগ্রাম আর্দশ কলেজে। সাইকেল চালিয়ে     কলেজে যাতায়াত করতেন । ২০১২ সালে জিপিএ ৪.৯০ পয়েন্ট পেয়েএইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

 

এরপর এলাকার পরিচিত এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় রংপুর শহরের একটি মেসে থেকে ভর্তির প্রস্ততি নিতে থাকেন। কিন্তু টাকার অভাবে ভর্তি কোচিং করা হয়নি তার। কোনো সংকটই তাকে আটকাতে পারেনি। ভর্তি যুদ্ধে তিনি সফল হয়েছেন, ২০১৪ সালে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে।

 

রেজাউল প্রামানিকের স্বপ্ন যে বিভাগে পড়ছেন সেখানকার শিক্ষক হওয়ার। এছাড়া লক্ষ্য সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার গড়ার।
কেন সাংবাদিক হতে চান এর জবাবে রেজাউলবলেন, এই পেশায় থেকে সাধারণ মানুষের জন্য অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। তাই ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে পারলেও তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে থাকবেন।##

পছন্দের আরো পোস্ট