প্রতিভা বিকাশে চাই সকলের অংশগ্রহণমূলক কর্ম পরিবেশ

19075টটআলোচনার বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে সৃষ্টি জগতের সকল বস্তুরাজিকে দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করছি। সে দু’টি শ্রেণীর একটি হচ্ছে জড় আর অন্যটি হচ্ছে জীব। জীব জগতে যত প্রণীর সমারোহ রয়েছে তার মাঝে শ্রেষ্ঠ প্রাণী হচ্ছে মানুষ। মানুষ যে শ্রেষ্ঠ প্রাণী সেটা স্বীকার করতে কারো দ্বিমত নেই অন্তত আমি আজ পর্যন্ত কারো মুখে শুনিনি। সৃষ্টিকর্তা নিজেও বলেছেন মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে এত বিশাল ব্যবধানের মূল যে কারণটি সেটি হচ্ছে মানুষ সৃষ্টিশীল অন্য কোনা প্রাণী সৃষ্টিশীল নয়। সৃষ্টিশীল এই অর্থে সভ্যতার ধারাবাহিক উন্নয়নে যতকিছু করা হয়েছে তার সবটুকুই করেছে মানুষ।

 

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে  শুরু করে বর্তমান সভ্যতার আজকের দিনটি পর্যন্ত যত আবিষ্কার তার শতভাগ কৃতিত্বই এই মানুষ নামক প্রাণীটির। পাথরে পাথরে ঘর্ষণের মাধ্যমে আগুন প্রজ্জ্বলন, পত্ররাজিতে নিজেদের আবৃতকরণ, প্রাকৃতিক এবং বন্য প্রাণিদের হাত থেকে রক্ষার জন্য অস্ত্র আবিষ্কার, বাসস্থান তৈরী ক্রমান্বয়ে ব্যবহারিক যন্ত্রপাতি, আধুনিক ঘরবাড়ি, মুদ্রা আবিষ্কার থেকে শুরু করে আজকের সর্বাধুনিক বোয়িং ৭৪৭-৮ আবিষ্কার, পৃথিবীর সর্বোচ্চ প্রাচীর দুবাই এর বার্জ খালিফা, চীনের সাংহাই টাওয়ার সবই করেছে ১৮ হাজার মাখলুকাতের সেরা মানুষ নামক এই প্রাণী গোষ্ঠি। অন্য কোন প্রাণী নয়।

 

আমরা বর্তমানে যে সভ্যতায় বসবাস করছি তা সব মানুষের সৃষ্টিকর্মের একটি সমন্বিত রূপ। একক কোন মানুষ সেই কৃতিত্বের দাবিদার হতে পারে না। আমরা সভ্যতার যে সুফল ভোগ করছি সেখানে সকল শ্রেণী পেশা মানুষের অবদান রয়েছে। প্রতিটি মানুষ তার নিজ নিজ কর্মের মাধ্যমে নিজ নিজ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রেখে যাচ্ছে সভ্যতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এখানে কারোর ভূমিকাকে খাটো করে দেখার বা চিন্তা করার সুযোগ নেই। সাংহাই টাওয়ার এর কথাই ধরা যাক।

 

সুউচ্চ এই ভবনটি নির্মাণে যেমন অবদান রয়েছে ভবনটির স্থপতির, তেমনি অবদান রয়েছে নির্মাণ শ্রমিক থেকে শুরু করে রং মিস্ত্রীরও। সবাই তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সুচারুভাবে কাজ করেছে বলেই সম্ভব হয়েছে এরকম একটি অত্যাধুনিক সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করা। একজন কৃষক তাঁর পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যদি না ফসল ফলাতো তাহলে বড় বড় বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, কবি সাহিত্যিক প্রমুখ সামিজিক গোষ্ঠির কি অবস্থা হতো  তা আমরা কখনো ভেবে দেখিনি।

 

আমরা শিক্ষিত জন গোষ্ঠির কথা বলে থাকি। আমার মতে প্রতিটি মানুষ শিক্ষিত। যে শিক্ষা জিনিসটা মানুষ অর্জন করে থাকে তার রয়েছে তিনটি ভিন্ন পদ্ধতি। তাই পদ্ধতিগত দিক থেকে শিক্ষাকে আমরা তিন ভাগে

 

ভাগ করতে পারি, যেমন – ঋড়ৎসধষ, ওহভড়ৎসধষ এবং ঘড়হ-ভড়ৎসধষ যার বাংলা যথাক্রমে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক এবং উপআনুষ্ঠানিক। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা হল যা আমরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এবং বই পুস্তক পড়ে শিখে থাকি। আর অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা হচ্ছে জন্মের পর থেকে বাবা মা, আত্মীয় পরিজন, পরিবেশ, প্রকৃতি ইত্যাদি থেকে যা শিখে থাকে। আর সর্বশেষ উপআনুষ্ঠানিক যে শিক্ষাটি তা হল মানুষ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কসপ, সেমিনার, সভা, সামাবেশ ইত্যাদি থেকে শিখে থাকে। এই আলোচনা থেকে আমরা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি তা হচ্ছে প্রতিটি মানুষ কমপক্ষে একপ্রকার শিক্ষায় শিক্ষিত। আবার কেউ কেউ তিনভাবেই শিক্ষিত। আর তাই প্রতিটি শিক্ষিত মানুষই তাঁর নিজস্ব শিক্ষার দ্বারা রাখতে পারে তাঁর জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান। কাউকে তাই খাটো করে দেখার কোনই সুযোগ নেই।

 

যে কথাটি বলতে আমি এতগুলো কথা বললাম তা হচ্ছে ”প্রতিটি মানুষই সৃষ্টিশীল” কারণ প্রতিটি মানুষের ভিতরেই রয়েছে সুপ্ত উদ্ভাবনী শক্তি।  এটিকে বিশ্বাস করলে এবং সবাইকে তার সুপ্ত উদ্ভাবনী শক্তিটিকে কাজে লাগিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দিলে আবিষ্কার এবং বিভিন্ন কাজের সমন্বিত ফলাফলটি হয়ে উঠবে আরো সহজ, সুন্দর এবং ফলপ্রসূ । বাস্তবতাটি কিন্তু ভিন্ন।  যাঁরা বিভিন্নভাবে  আনুষ্ঠানিক তথা অপ্রথাগত বা উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত আর অভিজ্ঞ এবং যাঁরা বিভিন্ন সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃস্থানীয় পদ দখল করে আছেন তাঁরা (অবশ্য সবার ক্ষেত্রে নয়)  চায় তাঁদের চেয়ে অল্প শিক্ষিত বা অল্প-অভিজ্ঞদের মাঝে  তাঁদের বিশ্বাস বা সিদ্ধান্তগুলোকে চাপিয়ে দিতে। এবং তাঁরা যেটাকে ’সঠিক’ মনে করেন তার বাইরে অন্যের মতামতকে মেনে নিতে পারেন না। তাঁরা কখনো ভাবেননা যে অধস্তনদের সুপ্ত প্রতিভা আর উদ্ভাবনী শক্তি নতুন আবিষ্কার বা কাজে যোগ করতে পারে নতুন মাত্রা। হয়ে উঠতে পারে আমাদের কর্মক্ষেত্র অনেক  মধুর এবং প্রাণবন্ত।

 

সেটি পেতে হলে যা করতে হবে তা হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণমূলক একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা। যেখানে অধস্তনদের যে  সুপ্ত উদ্ভাবনী শক্তিটি রয়েছে সেটিকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা। তাঁদের দ্বারা, তাঁদের নিজস্ব পদ্ধতিতে এবং তাঁদের নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ করে দেয়া। সে ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ যা করবেন তা হচ্ছে তাঁদের অভিজ্ঞতার আলোকে অধস্তনদেরকে পরামর্শ প্রদান করা। ফলে যেটা হবে অধস্তনদের মাঝে তৈরী হবে স্পৃহা, তাঁরা হয়ে উঠবে আবিষ্কার এবং নতুন কিছু করার আত্ম প্রত্যয়ী সম্ভাবনাময়ী মানুষ। তৈরী হবে কাজের অনুকূল পরিবেশ। সভ্যতা পাবে নতুন নতুন সৃষ্টি, কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠবে  মধুর এবং প্রাণবন্ত। কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠবে আরো গতিময়। সেই পরিবেশটা সৃষ্টি করে দেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে ঊর্ধ্বতনদের বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের।

 

 

মোঃ মহি উদ্দিন, এআইপিএম,সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা,ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

পছন্দের আরো পোস্ট