চাকুরীর ক্ষেত্রে বয়সের বাধা তুলে দিলে কেমন হয়?

আমরা তখন হলে থাকি, আমাদের রুম ৪১২ আর ৪১৪ তে থাকতেন তোফাজ্জল ভাই। তোফাজ্জল ভাই আমাদের একই সেশনের বাংলার ছাত্র। একই সেশন হলেও তিনি আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড়। ঐ সময়ই তাঁর মেয়ে ক্লাস ৮ম-৯ম এ পড়ে। তোফাজ্জল ভাইয়ের বাবা যখন মারা যান তখন তিনি সহ আরও কয়েক ভাই লেখা পড়া করে। এক সময় সবার লেখা পড়া চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সব ভাই বসে সিদ্ধান্ত নিল সবাই এক সাথে লেখা পড়া করলে সংসার চলবে না। কাউকে কৃষি কাজ করে সংসার চালাতে হবে। সিদ্ধান্ত মত তোফাজ্জল ভাই, বড় ভাই হিসাবে সংসারের দায়িত্ব গ্রহন করলেন। আর ছোট ভাইদের লেখাপড়া করালেন। ছোট ভাইরা যখন মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত তখন তোফাজ্জল ভাই লেখাপড়া শুরু করলেন । আমাদের সাথে এক সাথে পাশ করে বের হলেন। তিনি তাঁর ইচ্ছা শক্তির আর জ্ঞান পিপাসার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী গ্রহন করতে পেরেছিলেন।

 

বিদ্যা আর জ্ঞান সবসময়ই সম্পদ, তা থেকে সরাসরি দৃশ্যমান আর্থিক উন্নয়ন বা সামাজিক সম্মান আসুক বা না আসুক। ছোট সময়ে শুনেছিলাম “লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”। যদিও আজকাল গাড়িতে চড়তে চড়তে অধর্য্য হয়ে যেতে হয়, তাও গাড়ি চড়া আর শেষ হয় না। তবে বাণীটির প্রকৃত মর্মাথ আমাদের সবারই জানা, অর্থাৎ ব্যাক্তি পর্যায়ে আর্থ-সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে লেখাপড়া করার বা উচ্চ ডিগ্রী গ্রহনের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশে আমরা আমাদের পছন্দমত পেশা বেছে নেবার মত স্বাধীনতা ভোগ করতে পারি না। তাই আমরা যে যে বিষয়েই লেখাপড়া করি না কেন, যেকোন চাকুরির জন্যই সবাই এক যোগে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। কেউ একের পর এক চাকুরী পায় কেউ আবার বেকারই থেকে যায়। এটা খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া, এটা মেনে নিয়েই আমাদের চলতে হয়, আমরা মেনে নিয়েছি। তাইতো ফলিত রসায়ন বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে এসে আমরা ব্যাংকার হচ্ছি, আবার কেউ বা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রীর পরও আইবিএ/এন এস ইউ এর এমবিএ, বি আই বি এম এর এমবিএম, সি এ, আই সি এম এ – ইত্যাদি ডিগ্রী গ্রহন করতে না পারলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছেন না। এগুলো সবই স্বাভাবিক বিষয়, কারণ প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন এবং যোগ্যতার প্রমান দিয়েই তাঁরা চাকুরী পাচ্ছেন।

 

আমার আলোচনা ভিন্ন যায়গায়। সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়স ৩০-৩২। এই নিয়ম অনুসরণ করে বেসরকারী চাকুরিতেও অনেক প্রতিষ্ঠানে একই নিয়ম চালু রয়েছে। এই বয়সের বাধা তুলে দিলে কেমন হয়? সকল চাকুরির ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি একই রকম থাকবে কেবল, আবেদনের কোন বয়স সীমা থাকবেনা। এতে অধিকতর প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা থাকবে, আর অধিকতর যোগ্য প্রার্থিরাই চাকুরী পাবে । এতে একদিকে যেমন সবাই নিজেকে সবসময় যোগ্য করে গড়ে তুলবার প্রয়জনীয়তা অনুভব করবেন অন্যদিকে যেকোন বয়সে চাকুরী পরিবর্তন করে নতুন চাকুরী গ্রহন করতে পারবেন। এখন যেহেতু সেই সুযোগটি নেই তাই আমরা নিজেকে বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে যথাযথভাবে গড়ে তুলছিনা। অপরদিকে যেহেতু এই চাকুরীটাই একমাত্র সম্বল, চাকুরী চলে গেলে অন্য কোথাও তেমন কিছুই করার থাকে না তাই আমাদের অফিসও অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর অপরাধকে মানবিকভাবে বিবেচনা করে ক্ষমা করে দেয়।

 

চাকুরীর আবেদনের ক্ষেত্রে বয়স সীমা না থাকলে আমাদের তোফাজ্জল ভাইয়ের মত যাদের ব্রেক অফ স্টাডি আছে তাঁরা আবেদনের সুযোগ পাবেন। নবিন আর প্রবীণের পার্থক্যতো থাকবেই,নবীন কর্মী যেমন ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করতে পারবে, অপর দিকে প্রবীনের রয়েছেন অভিজ্ঞতা। চাকুরীদাতাই নির্ধারন করবেন তিনি কাকে গ্রহন করবেন। তাই কেবল মাত্র বয়সের কারনে একজন ব্যাক্তি চাকুরীরি আবেদনই করতে পারবে না ,আমার কাছে অমানবিক মনে হয়। বিশ্বের অনেক দেশে চাকুরীর আবেদনের বয়স সীমা আরও অনেক বেশী। আমাদেরও ভেবে দেখা যায়।

 

 

পছন্দের আরো পোস্ট