শেকৃবিতে ভেষজ উদ্ভিদ ‘রুকোলা’ চাষ

?
?

ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে ভেষজ গুণসমৃদ্ধ উদ্ভিদ রুকোলা এখন রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সফলভাবে চাষ হচ্ছে। যা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় চাষ হওয়া প্রথম উদ্ভিদ। এ অসাধ্যকে সম্ভব করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুর রহিম। ২০১৪ সালে ইতালি থেকে বীজ সংগ্রহ করে তিনি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় রুকোলা উৎপাদনের জন্য গবেষণা চালিয়েছেন। ড. রহিম এ উদ্ভিদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দাবী করছেন, নিয়মিত প্রচুর পরিমাণে সবুজ রুকোলা গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগ ও রক্তনালী সংক্রান্ত রোগের বিরুদ্ধে আমাদের দেহে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠার কার্যকর ভূমিকা রাখে। বর্তমানে এটি বাণিজ্যিকভাবে ইতালি, ফ্রান্স,পর্তুগাল ও চেকপ্রজাতন্ত্র, মিশর, তুরস্ক ও আমেরিকাতে চাষ হচ্ছে। তার এই সাফল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য প্রফেসর মো. শাদাত উল্লা অভিনন্দন জানিয়েছেন।

 

এ ব্যাপারে ড.আব্দুর রহিম বলেন, এর সবুজ পাতায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সহায়ক রাসায়নিক উপাদান, যেমন-সালফিউরাফ্যান, থায়োসায়ানেটস, আইসো-থায়োসায়ানেটস, ইনডলস ও আলফা-লিপোইক অ্যাসিড। এরা সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার যেমন-প্রোস্টেট, ব্রেস্ট, সারভিক্যাল, কোলন ও ওভারিয়ান ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। ‘হিস্টোন ডিঅ্যাসিটাইলেজ’ নামক এনজাইমের কার্যকারিতা ব্যাহত করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধিতে বাধা দেয় এই সালফিউরাফ্যান।

 

অস্ট্রেলিয়ান ‘রুরাল ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলাপমেন্ট কর্পোরেশন (আরআইআরডিসি)’ এর মতে, সবুজ রুকোলা পাতার ক্যান্সার প্রতিরোধ ক্ষমতা সরিষা পরিবারের অন্যান্য শাক-সবজি থেকে অনেক বেশি। রুকোলার সবুজ পাতা যেহেতু সরাসরি পিজা এবং সালাদে ব্যাবহৃত হয়, সেহেতু সবুজ পাতায় থাকা ক্লোরোফিল, হেটারোসাইক্লিক অ্যামাইন যা সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রায় তেলে ভাজলে বা ঝলসালে নিঃসৃত হয় এর কার্সেনোজেনিক প্রভাব থেকে রক্ষা করে।

 

আমেরিকার ‘ন্যাশনাল নিউট্রিয়েন্ট ডেটাবেস (স্ট্যান্ডার্ডরেফারেন্স)’ অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম সবুজ রুকোলা পাতাতে শক্তি রয়েছে মাত্র ২৫ কিলো ক্যালরি; কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে ফলিক অ্যাসিড (৯৭ মাইক্রোগ্রাম), ভিটামিন-এ (২৩৭৩ আইইউ), ভিটামিন-সি (১৫ মিলিগ্রাম), ভিটামিন-কে (১০৮.৬ মাইক্রোগ্রাম) এবং ভিটামিন-বি-কমপ্লেক্স।

 

 

গ্রহণযোগ্য মাত্রায় রয়েছে ফ্লাভোনল নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ত্বক, ফুসফুস এবং মুখ-গহ্বরের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। রুকোলা পাতাতে প্রচুর পরিমাণে কপার ও আয়রন জাতীয় খনিজ উপাদানও রয়েছে। রয়েছে স্বল্প পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও ফসফরাস।

 

এ উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পর্কে ড.আব্দুর রহিম জানান, রুকোলা একটি শীত পছন্দকারী উদ্ভিদ। শীতকালে দ্রুত পাতার বৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু বসন্তকালে গরম আবহাওয়ায় ঊর্ধ্বমুখী ফুলের স্টক তৈরি করে এবং বীজ ধারণ করে। এ উদ্ভিদটি প্রায় ২০-১০০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। বীজ বপনের একমাস পরেই পাতা সংগ্রহ করা যায়। রুকোলার পাতা রসালো, লম্বাটে ও খাঁজযুক্ত। শিকড় ছাড়া এ উদ্ভিদের সব অংশই, যেমন-পাতা, ফুল, অপরিপক্ক পড ও বীজখাবার উপযোগী।

 

তবে পাতাই খাদ্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। রুকোলার সবুজ সতেজ পাতা সরাসরি কাঁচা সালাদ হিসেবে টমেটো, জলপাই ও পনিরের সাথে, পিজা তৈরির পর পরিবেশনের সময় পিজা টপিং হিসেবে, পাস্তার সাথে এবং মাছ ও মাংস দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এ ছাড়াও এর বীজ থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদন করা যায়। কখনো কখনো এটা শাক হিসাবে পালং শাকের মতোই রান্না করা হয়।

 

এ বংশপরিচয় সম্পর্কে তিনি জানান, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন- ইতালিতে ‘রুকোলা’, আমেরিকাতে ‘আ রুগুলা’, জার্মানিতে ‘সালাট্রুকা’, স্পেনে ‘ইরুকা’ এবং ফ্রান্সে ‘রকেট’। রুকোলার উৎপত্তি স্থান হচ্ছে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল। ইতালিতে রুকোলা রোমান কাল থেকে চাষ করা হচ্ছে, তাই ধারণা করা হয় যে ইতালিই এর উৎপত্তি স্থান। এ অঞ্চল থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশে এটি বিস্তার লাভ করে।

 

রুকোলা হচ্ছে সরিষা পরিবারের (ইৎধংংরপধপবধব) একাটি বর্ষজীবি, দুর্বলকা- ও সবুজ পাতাবিশিষ্ট উদ্ভিদ, যার বৈজ্ঞানিক নাম ঊৎঁপধ ংধঃরাধ এই প্রজাতির দেহগত ক্রোমোসোম সংখ্যা ২হ = ২২ এবং বীজই হচ্ছে বংশ বিস্তারের একমাত্র মাধ্যম।

 

ড. রহিম বলছেন,  আমাদের দেশে এ পর্যন্ত কোথাও রুকোলা চাষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম ইতালি থেকে বীজ সংগ্রহ করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগে এই উপকারী উদ্ভিদটি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, এটি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সারা বছর জন্মানোর উপযোগী। তবে পাতার বৃদ্ধি ও উৎপাদন শীতকালে সবচেয়ে বেশি হয়। কিন্তু পাতার মতো সারা বছর বীজ উৎপাদন করা যায় না, শুধুমাত্র শীতের শেষে-বসন্তের শুরুতে এ উদ্ভিদটি ফুল ও বীজ উৎপাদন করে। বাংলাদেশে রুকোলা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

 

যেহেতু সারা বছর রুকোলার পাতা উৎপাদন সম্ভব, তাই গ্রামে বাড়ির আঙিনায় সামান্য একটু জায়গায় এবং শহরে ৪-৫টি টবে বাসার ছাদে কিংবা ঝুল-বারান্দায় জন্মিয়ে সারা বছর সতেজ পাতা পাওয়া সম্ভব।

 

মোঃ বশিরুল ইসলাম: জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

 

লেখাপড়া২৪.কম/আরএইচ

পছন্দের আরো পোস্ট