বাঁচার আকুতি

tomalনতুন বছরে এতো সকালে ঘুম থেকে জাগা আজই প্রথম। বিছানায় ঝাকুনি ও হলের বিভিন্ন দিক থেকে চিৎকার শুনে সকাল ৫ টা ৬ মিনিটের দিকে ঘুম ভেঙ্গে যায়। তাৎক্ষণিক রুমমেটকে জাগিয়ে কক্ষের বাহিরে যাই। দেখি অনেক শিক্ষার্থী হলের বাহিরে। হলের মাঝে ফাকা স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের সবার চোখে-মুখে এক রাজ্যের ভয় ও আতঙ্ক। অনেকের পায়ে জুতা বা স্যান্ডেল নেই। বোঝাই যাচ্ছে, কোনো এক বড় আতঙ্কে তারা কক্ষের বাহিরে এসেছে।

 

তাদের থেকেই জানতে পারলাম ভূমিকম্পের কথা। এরপর আতঙ্ক আমাকেও ভর করে। দ্রুত হলের বাহিরে চলে যাই। গিয়ে দেখি, অন্য দুই হলেরও একই অবস্থা। শিক্ষার্থীরা সবাই হল গেটে এসে ভীড় করছেন। অনেকে বাহিরে এসেছেন।

 

আশ্চার্যিত না হয়ে পারলাম না। এতো সকালে তিন হলের সব শিক্ষার্থী বাহিরে চলে এসেছে? কিভাবে সম্ভব! বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা ক্লাস না থাকলে স্বাধারণত ৮-৯টার আগে ঘুম থেকে কখনই ওঠেন না (ব্যতিক্রম ছাড়া)। আজ তারা সবাই ঘুম থেকে উঠেছেন। অনুমান হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ১৬ টি আবাসিক হল ও একটি ডরমেটরির বোধহয় একই অবস্থা। শিক্ষার্থী ও ফেলোরা এভাবেই ঘুম থেকে উঠেছেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও হয়তো একইভাবে কাক ডাকা ভোরেরও আগে ঘুম থেকে ওঠেছিল।

 

কারণ একটাই, মৃত্যু ভয়। বাঁচার আকুতি। জানিনা যারা আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করেন না তাদের কি অবস্থা হয়েছিল আজকের দিনে। তারাও কি মৃত্যুর ভয়ে কক্ষের বাহিরে গিয়েছিলেন। খুব জানতে ইচ্ছা করে।

 

এর আগে গত বছরের ২৬ ও ২৭ এপ্রিল নেপালে ভূমিকম্প হয় বিভিন্ন স্কেলে। প্রথম দিন ৭.৯ মাত্রায় ও পরের দিন ৬.৬ মাত্রায়। তবে আজকের ভূমিকম্প রিক্টার স্কেলে ছিল ৬.৭ মাত্রায়। এই ভূকম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মণিপুর। রাতে ভেবেছিলাম, এবারের ভূকম্পন বোদহয় বেশি হবে। পরে ফেসবুকে গিয়ে উত্তর পেলাম। এবারের ভূমিকম্পে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ও ঢাকায় একজন মারা গেছেন। সঙ্গে কিছু আহতও হয়েছেন।

 

ভূমিকম্প কেনো হয়:ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে ভূপৃষ্ঠের নীচে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় রয়েছে কঠিন ভূত্বক। ভূত্বকের নীচে প্রায় ১০০ কি.মি. পূরু একটি শীতল কঠিন পদার্থেরস্তর রয়েছে। একে লিথোস্ফেয়ার (খরঃযড়ংঢ়যবৎব) বা কঠিন শিলাত্বক নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের পৃথিবী নামের এই গ্রহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, কঠিন শিলাত্বকসহ (লিথোস্ফেয়ার)-এর ভূপৃষ্ঠ বেশ কিছু সংখ্যক শক্ত শিলাত্বকের প্লেট (চষধঃব) এর মধ্যে খন্ড খন্ড অবস্থায় অবস্থান করছে। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে এই প্লেটের চ্যুতি বা নড়া-চড়ার কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

 

ভূমিকম্প যে কারণেই হোক না কেনো তা আমাদের জন্য খারাপ খবর। আমাদের জন্য একটি কষ্টের বার্তা নিয়ে আসে। জগতকে ভালোবেসে চারিপাশে কতোকিছুই না তৈরী হচ্ছে। বড় বড় দালান হচ্ছে। ভূমিকম্পকে রোধ করতে অনেকে দেশেই তৈরী হয়েছে অনেক কিছুই।

 

সব কিছুই করা হচ্ছে জগতে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য। সুস্থ থাকতে মানুষ কতো কিছুই না করছে। সুন্দর বাড়ী বানাচ্ছে। সুন্দর সুন্দর পোশাক পড়ছে। নিয়ম করে ভালো খাবার খাচ্ছে। ধনি ব্যক্তিরা নিজেদের স্বাদ-আহ্লাদ পূর্ণ করতে আরও কতো কিছুই না করছে।

 

তবে যারা গরিব-দিন এনে দিন খান তাদের এসব বিষয় নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কারণ, তারা জগতে খুব বেশি বাঁচার আশা করেন না। তবুও অনেক দিন তারা খেয়ে-না খেয়ে বাঁচেন। তাদের জন্য উচু তলার ব্যক্তিরা হয়তো একবারের জন্যও ভাবেন না। নিচু তলার মানুষরা কি খাচ্ছেন-কি পড়ছেন তা দেখার সত্যি সময় নেই আমাদের। সর্বদা নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় আমাদের।

 

আমরা যারা পরিবার থেকে অনেক দূরে আছি, এমনও হয়েছে-সপ্তাহে দুই দিনও বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়া হয়নি। যদিও জানি তারা ভালোই আছেন। আর যারা দেশের বাহিরে আছেন তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম।

 

আমরা সব কিছুই করছি শুধু বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু আদতে কি আমাদের মতো করে আমরা বেঁচে থাকতে পারছি? ইসলাম ধর্ম মতে, মানুষের জন্ম-মৃত্যু সব পূর্ব নির্ধারিত। এমনকি জগতের সমস্ত কিছুই নাকি আগে থেকে নির্ধারণ করা। তাই যদি হয় তাহলে মৃত্য নিয়ে এতো ভয়ের কি আছে। ভূমিকম্প হওয়ার সময় দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করার কি আছে।

 

কিন্তু তবুও আমরা তা করছি। অনেকে দৌড়ে মারা পড়ছেন। আবার অনেকে ঘরে বসে থেকে বেঁচে যাচ্ছেন। এটাই হলো নিয়তি। তার বাহিরে যাওয়ার কোনো শিক্ষা এখনও আমি পাইনি।#

 

 

লেখাপড়া২৪.কম/জাকির/রাবি/আরএইচ

পছন্দের আরো পোস্ট