রূপ বৈচিত্রে অনিন্দ্য নাগলিঙ্গম

Naglingom Pic2শাখায় নয়, ফুল ফোটে গাছের গুঁড়িতে। গুঁড়ি ফুঁড়ে বের হয় কুশি। লতার মতো লম্বা কুশিতে থোকায় থোকায় হাজারো কুড়ি। সেই কুড়ি ক্রমেই ফুটে লাল শিমুল ফুলের আকার ধারণ করে। পাপড়ি, রেণু, ফুলের গঠন নাগলিঙ্গমকে করেছে আরো মোহনীয়। শিমুলের পাপড়িগুলো সোজাসাপ্টা হলেও এ ফুলের পাপড়ির মাথা সাপের মতো ফনা আকৃতির বলেই অনিন্দ্য সুন্দর নাগলিঙ্গম।

 

স্থানীয়ভাবে এ ফুলকে ‘নাগরাজ’ নাম দেয়া হয়েছে। তবে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বলেন এটির নাম ‘নাগলিঙ্গম’। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, এটি লিগুসিমেনি গোত্র অথবা উপগোত্র সিসিল প্রিনয়েডি হতে পারে। তবে এটি আমাদের এলাকায় বিরল প্রকৃতির গাছ। এই ফুল সচরাচর দেখা মেলে না তাই বেশির ভাগ মানুষের কাছে অপরিচিত। খুব অচেনা ও বিরল প্রজাতির এ গাছটি সাধারণত থাইল্যান্ড ও ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে দেখা মেলে। তবে নাগলিঙ্গম এখন চোখে পড়ে না বললেই চলে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকটি গাছ আছে। এসব গাছ এখন প্রায় গোড়া থেকে পুরো কান্ড ফুলে ফুলে ভরা। সকালে হাঁটতে গিয়ে বাতাসে সৌরভ ছড়ানো নাগলিঙ্গমের তলা দিয়ে যাওয়ার সময় মনে অন্য রকম আবেশ ছড়িয়ে দেয়।

 

দৃষ্টিনন্দন নাগলিঙ্গম ফুলটি ফোটে মার্চ থেকে ডিসেম্বরে। দীর্ঘ বৃক্ষ আর ছাতিম গাছের মতো পাতা। চারা রোপণের ১২-১৪ বছর পর ফুল ফোটে। ফুল উজ্জ্বল গোলাপি, পাপড়ি ছয়টি, পাপড়ি গোলাকার কুন্ডলিপাকানো। প্রস্ফুটিত ফুলের পরাগ কেশর অবিকল সাপের ফণার মতো। আর সে কারণেই নাম নাগলিঙ্গম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। নাগলিঙ্গম গাছের রয়েছে ব্যাপক ঔষধি গুণ। এর বাকল, ফুল আর ফল থেকে এন্টিবায়োটিক, এন্টিফাঙ্গাল, এন্টিসেপটিক, এনালজেসিক ঔষুধ আবিষ্কার হয়েছে। ঠান্ডা সারাতে আর পেট ব্যাথায় এই গাছ ব্যাবহার পাওয়া যায়। দক্ষিন আমেরিকায় ম্যালেরিয়া কমানোর কাজে এর পাতা ব্যবহৃত হয়।

 

নাগলিঙ্গমের সৌন্দর্যে অভিভূত উদ্ভিদপ্রেমী দ্বিজেন শর্মা তার শ্যামলী নিসর্গ বইয়ে লিখেছেন, ‘আপনি বর্ণে, গন্ধে, বিন্যাসে অবশ্যই মুগ্ধ হবেন। এমন আশ্চর্য ভোরের একটি মনোহর অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অনেক দিন আপনার মনে থাকবে।’ তিনি জানাচ্ছেন, নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চলে। নাগলিঙ্গম পৃথিবীসহ আমাদের দেশেও বেশ দুর্লভ। পৃথিবীর অপর পিঠের দেশটি থেকে এই নয়নকাড়া ফুলের গাছটি কবে, কেমন করে এ অঞ্চলে এসেছিল, ভারতবর্ষের কোথায় তার জন্ম হলো প্রথম, সেসব রহস্য উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছেও দুর্ভেদ্য।

 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. ছোলায়মান আলী ফকির জানান, ‘নাগলিঙ্গম’ আমাদের দেশ খুবই বিরল। সচরাসচর দেখা মেলে না। আমাদের বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ঢাকার বলদা গার্ডেনে কয়েকটি গাছ রয়েছে। এটির খুব বেশি ওষুধি গুণ না থাকলেও সৌন্দর্য বর্ধণ করে। এটিকে ভেন্যু ট্রিও বলা হয়। এদেরকে সাধারণত আফ্রিকা, থাইল্যান্ড ও ভারতের বিভিন্ন উপাশনালয়ে দেখা যায়।

 

বসন্তে যেমন শিমুল গাছতলা ঝরা ফুলে ভরে থাকে, নাগলিঙ্গমের তলাও তেমনি এর অজ¯্র পাপড়িতে ছেয়ে থাকে। প্রকান্ড বৃক্ষ আর পাতা লম্বা, ডগা সুচালো, শাখার সঙ্গে লেগে থাকা ফুলের সৌরভ মন মাতালেও গাঢ় বাদামি রঙের ফলগুলো পেকে যখন খসে পড়ে, তখন সেগুলো পচে কটু গন্ধ ছড়ায়। ফলে অজস্র বীজ থাকে, তা থেকে চারা তৈরি করা যায়। তবে নাগলিঙ্গম বাড়ে ধীরে। তা সত্ত্বে ও বর্ণে, গন্ধে, উজ্জ্বলতায় তরু রাজ্যে বড় কোনো বাগান পরিপূর্ণ করতে নাগলিঙ্গম অনন্য।

 

লেখাপড়া২৪.কম/বাকৃবি/রহমান/এমএএ-০৫০৬

পছন্দের আরো পোস্ট