৫৪ বছরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

picturআজ সোমবার ৫৪ বছরে পা রাখল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। মানসম্মত উচ্চতর কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার নিশ্চয়তা বিধান এবং নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে একটি শক্তিশালী আর্থ-সামজিক অবকাঠামো উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৫৯ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশন এবং খাদ্য ও কৃষি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় ১৯৬১ সালের ৮ জুন। এরপর ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষে ময়মনসিংহস্থ অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি ও ভেটেরিনারি কলেজ প্রাঙ্গণকে কেন্দ্র করে শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে ‘এডাপটেশন অফ ইউনিভার্সিটি ল’জ’ অধ্যাদেশ বলে এর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
রাজধানী ঢাকা থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে এবং ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দক্ষিণে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম প্রান্তে ১২০০ একর এলাকাজুড়ে বাকৃবি অবস্থিত।

১৯৬১ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছিল ভেটেরিনারি ও কৃষি অনুষদ দিয়ে। ২৩টি শিক্ষা বিভাগে তখন মাত্র ৩০ জন শিক্ষক ছিলেন। মোট শিক্ষার্থী ছিল ৪৪৪ জন।

বর্তমানে ছয়টি অনুষদের আওতায় ৪৩টি বিভাগে মোট ৫৬০ জন শিক্ষক রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ে তিন হাজার ৯৫৯ জন, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ১ হাজার ৪০ জন এবং পিএইচডি পর্যায়ে ৩৭৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৬টি অনুষদ ভবন, প্রশাসনিক ভবন, ছাত্রদের ৯টি এবং ছাত্রীদের ৩টি আবাসিক হল। এছাড়া রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে গবেষণা খামার, সমৃদ্ধ বোটানিক্যাল গার্ডেন, ফলের জাত উন্নয়নের জন্য জার্মপ্লাজম সেন্টার, দেশের একমাত্র কৃষি জাদুঘর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র উদ্ভিদের রোগ নির্ণয়ের ক্লিনিক এবং মাৎস্য জাদুঘর, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সমপ্রসারণ কেন্দ্র (বাউএক), সিড প্যাথলজি সেন্টার, কেন্দ্রীয় গবেষণাগার, বায়োটেকনোলজি ল্যাব, ভেটেরিনারি ক্লিনিকসহ কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন সুবিধা সংবলিত স্থাপনা।

এছাড়া দেশের কৃষি সম্পর্কিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) প্রধান কার্যালয় বাকৃবির সবুজ ক্যাম্পাসেই অবস্থিত।

বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে কর্তৃপক্ষ ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশর ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা দিতে এ বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে যাচ্ছে।

গবেষণায় সাফল্যঃ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শস্যের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এগুলোর মধ্যে বাউ-৬৩, বাউকুল, বাউধান-২, নামে উফশী ধান জাত- সম্পদ ও সম্বল, বাউ-এম/৩৯৫, বাউ-এম/৩৯৬ নামে ৪টি উফসি সরিষা জাত, ডেভিস, ব্র্যাগ, সোহাগ, জি-২ ও বিএস-৪ নামে ৫টি সয়াবিন জাত, কমলা সুন্দরী ও তৃপ্তি নামে আলুর জাত, লতিরাজ, বিলাসী ও দৌলতপুরী নামে তিনটি মুখীকচুর জাত, কলা ও আনারস উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তি, রাইজোবিয়াম জৈব সার উৎপাদন প্রযুক্তি, সয়েল টেস্টিং কিট, পেয়ারা গাছের মড়ক নিবারণ পদ্ধতি, বীজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা সহজ পদ্ধতি, অ্যারোবিক পদ্ধতিতে ধান চাষ প্রযুক্তি, শুকানো পদ্ধতিতে বোরো ধান চাষ, পশু খাদ্য হিসেবে ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধির কলাকৌশল। আফ্রিকান ধৈঞ্চার অঙ্গজ প্রজনন, এলামনডা ট্যাবলেট, আইপিএম ল্যাব বায়োপেস্টিসাইড, বিলুপ্তপ্রায় শাকসবজি ও ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও মলিকুলার বৈশিষ্ট সনাক্তকরণ কলাকৌশল, মোরগ-মুরগির রাণীক্ষেত রোগ ও ফাউলপক্সের প্রতিষেধক টিকা উৎপাদন, হাঁসের প্লেগ ভ্যাকসিন ও হাঁস-মুরগির ফাউল কলেরার ভ্যাকসিন তৈরি, রাণীক্ষেত রোগ সহজেই সনাক্তকরণে মলিকুলার পদ্ধতির উদ্ভাবন, মুরগির স্যালমোনোসিস রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি; হাওর এলাকায় হাঁস পালনের কলাকৌশল, কমিউনিটি ভিত্তিক উৎপাদনমুখী ভেটেরিনারি সেবা, গবাদিপশুর ভ্রুণ প্রতিস্থাপন, ছাগল ও মহিষের কৃত্রিম প্রজনন, কৃত্রিম প্রজননে ব্যবহৃত ষাঁড়ের আগাম ফার্টিলিটি নির্ণয়, গাভীর উলানফোলা রোগ প্রতিরোধ কৌশল, হরমোন পরীক্ষার মাধ্যমে গরু ও মহিষের গর্ভ নির্ণয়, সুষম পোল্ট্রি খাদ্য, গো-খাদ্য হিসেবে খড়ের সঙ্গে ইউরিয়া-মোলাসেস ব্লক ব্যবহার, হাঁস-মুরগির উন্নত জাত উৎপাদন, কৃষি অর্থনীতি বিষয়ে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানী গবেষণা তৎপরতার মাধ্যমে টেকসই শস্যবীমা কার্যক্রম, ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রমের উন্নয়ন, পশুসম্পদ উপখাত ও ডেয়রি উৎপাদনের উন্নয়ন, স্বল্প ব্যয়ে সেচনালা তৈরি, উন্নত ধরনের লাঙ্গল ও স্প্রে মেশিন, বাকৃবি জিয়া সার-বীজ ছিটানো যন্ত্র, সোলার ড্রায়ার, উন্নত ধরনের হস্তচালিত টিউবয়েল পাম্প, জ্বালানি সাশ্রয়ী উন্নতমানের দেশি চুলা, মাগুর ও শিং মাছের কৃত্রিম প্রজননের কলাকৌশল, ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি, খাচায় পাঙ্গাস চাষ, পেরিফাইটন বেজড মৎস্যচাষ, দেশি পাঙ্গাসের কৃত্রিম প্রজনন, ডাকউইড দিয়ে মিশ্র মৎস্যচাষ, মাছের জীবন্ত খাদ্য হিসেবে টিউবিফিসিড উৎপাদনের কলাকৌশল, পুকুরে মাগুর চাষের উপযোগী সহজলভ্য মৎস্যখাদ্য তৈরি, শুক্রাণু ক্রয়োপ্রিজারভেশন প্রযুক্তি, স্বল্প ব্যয়-মিডিয়ামে ক্লোরেলার চাষ, মাছের পোনা পালনের জন্য রটিফারের চাষ, মাছের রোগ প্রতিরোধকল্পে ঔষধি গাছের ব্যবহার এবং মলিকুলার পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছের বংশ পরিক্রম নির্ণয়, তারাবাইম, গুচিবাইম ও বাটা মাছের কৃত্রিম প্রজনন, ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ, পুকুরে মাছ চাষ, সহজলভ্য মাছের খাদ্য তৈরি, একোয়াপনিক্সের মাধ্যমে মাছ এবং সবজি উৎপাদন, মাছের বিকল্প খাদ্যের জন্য ব্লাক সোলজার ফ্লাই চাষ এবং কচি গমের পাউডার উৎপাদন।

 

পছন্দের আরো পোস্ট