শেষ হয়নি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ

Primari-educationপ্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার দেড় বছর পরও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জাতীয়করণ কাজ শেষ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এ প্রক্রিয়া আটকে আছে। আর এ কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার শিক্ষক। তারা পাচ্ছেন না সরকারি হিসাবে বেতন-ভাতা।

এমনকি বেসরকারি হিসাবে এমপিও পাননি নয় মাস ধরে। ফলে অর্থাভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সারা দেশে ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় তিন ধাপে অধিগ্রহণ এবং এসব প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ৩ হাজার ১৯২ জন শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ হওয়ার কথা।

বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (বিলুপ্ত ঘোষিত) মহাসচিব আবদুস সালাম খান অভিযোগ করেন, এর মধ্যে প্রথম ধাপে অধিগ্রহণকৃত বিদ্যালয়ের অন্তত সাড়ে ৫ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ এবং দ্বিতীয় ধাপে আরও ৮ হাজার জনের পদসৃষ্টির ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের অবহেলা ও কাজের ধীরগতির কারণে এসব শিক্ষকের ভোগান্তি প্রলম্বিত হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার কারণে বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সহযোগিতা না করায় হাজার হাজার শিক্ষকের দুঃস্বপ্নের দিন শেষ হচ্ছে না।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী কাজে অবহেলা ও ধীরগতির বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, পদ সৃষ্টি আর চাকরি জাতীয়করণ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান অনেক আইনকানুন দেখতে হয়। এর বাইরে নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিকটিও যাচাই-বাছাই করতে হয়। পাশাপাশি অর্থের সংস্থানের বিষয়ও রয়েছে। এসব কাজ শুধু একটি মন্ত্রণালয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তার পরও অগ্রাধিকার বিষয় হিসেবে তারা এটি বিবেচনা করছেন বলে জানান তিনি।

গতবছরের ৯ জানুয়ারি রাজধানীর প্যারেড গ্রাউন্ডে এক শিক্ষক মহাসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যালয় জাতীয়করণের ওই ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় সরকারি হওয়া শিক্ষকরা যথাক্রমে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি, একই বছরের ১ জুলাই এবং ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সরকারি বেতন-ভাতা পাবেন। এর আগে এসব বিদ্যালয় ও এর শিক্ষকদের জাতীয়করণের কাজ শেষ করতে হবে।

ইতিমধ্যে প্রথম ধাপের এমপিওভুক্ত ২২ হাজার ৯২৫টি বিদ্যালয় জাতীয়করণের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এই ধাপের বেশিরভাগ শিক্ষক সরকারি হিসাবে ইতিমধ্যে বেতন-ভাতা পেয়েছেন। কিন্তু যেসব কমিউনিটি বেসরকারি বিদ্যালয় জাতীয়করণ হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণের গেজেট জারি হয়নি।

এখানেই শেষ নয়, বিগত নয় মাস ধরে তাদের বেতন-ভাতাও আটকে ছিল। আগের হিসাবে এমপিও পর্যন্ত এ সময়ে দেয়া হয়নি। আর চাকরি জাতীয়করণের গেজেট না হওয়ায় সরকারি বেতনও পাচ্ছেন না।

এ অবস্থায় শিক্ষক নেতারা এ নিয়ে দেনদরবার করেন মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাভবনে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এবং ঈদ সামনে রেখে ২৭ জুলাই তাদের ১০ মাসের এমপিও ছাড়ের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, তাদের চাকরি জাতীয়করণ হবে কবে?

এর বাইরে প্রথম ধাপের আরও সাড়ে ৫শ’ শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ প্রক্রিয়াও আটকে আছে। জানা গেছে, গতবছরের সেপ্টেম্বরে এসব শিক্ষক এমপিও পেয়েছিলেন। অর্থাৎ, চাকরি জাতীয়করণের গেজেট হওয়ার পর এমপিও পাওয়ায় এদের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বেগম আখতারি মমতাজ জানান, তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোনো ফাইল আটকে নেই। অসম্পূর্ণ তথ্যসংবলিত ফাইল আসায় তথ্য চেয়ে তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ১৩ জুলাই এক বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা শেষে আরও কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে। সেসব তথ্য পেলেই কাজ এগিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী দ্বিতীয় দফায় দুই হাজার ২৫২টি রেজিস্টার্ড বিদ্যালয় জাতীয়করণ হওয়ার কথা। এদের প্রক্রিয়া শেষ ও বেতন পাওয়ার কথা ছিল গত বছরের ১ জুলাই। কিন্তু বিদ্যালয় জাতীয়করণের আদেশ হয় ৮ অক্টোবর। এরপর এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদ সৃষ্টি ও চাকরি জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অক্টোবরেই পদ সৃষ্টির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানো হয়। কিন্তু বিগত নয় মাসেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাদের কাজ শেষ করতে পারেনি।

অভিযোগ উঠেছে, এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ধীরে চল নীতি গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ গত ১৩ জুলাই এ নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বৈঠকও হয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদ সৃষ্টির কাজ শেষ হয়নি। ফলে এ দফায় জাতীয়করণের অপেক্ষায় অন্তত ৮ হাজার শিক্ষক রয়েছেন বলে জানা গেছে। বেতন-ভাতা না পেয়ে এসব শিক্ষকও অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন।

আর তৃতীয় দফায় নিবন্ধনের জন্য অপেক্ষমাণ এমন ৯৬০টি বিদ্যালয় চলতি বছরের (২০১৪ সাল) ১ জানুয়ারি থেকে জাতীয়করণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের কাজ শেষ না হওয়ায় এসব বিদ্যালয় অধিগ্রহণ কাজ শেষ হয়নি। ফলে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এবং জাতীয়করণ সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের সদস্যসচিব আবুল কালাম বলেন, কিছু বিদ্যালয়ের অধিগ্রহণ বাকি রয়েছে। এর বাইরে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ এবং পদ সৃষ্টির কাজ বাকি রয়েছে। এ নিয়ে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।

EH

পছন্দের আরো পোস্ট