বিদেশী ভার্সিটির শাখা অনুমোদন প্রাইভেট ভার্সিটি আইনের পরিপন্থী

Education-ministriবিদেশী ভার্সিটির শাখা অনুমোদন প্রাইভেট ভার্সিটি আইনের পরিপন্থী শিক্ষা ব্যবসায়ীদের স্বার্থে প্রণীত ‘বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা-২০১৪’ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা- সবাই এই বিধিমালাকে উচ্চশিক্ষার পরিপন্থী আখ্যায়িত করে অবিলম্বে তা বাতিলের দাবি করছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, সরকার দেশের বিদ্যমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো (৭৯টি) নিয়ন্ত্রণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কার্যত ব্যর্থ।

সম্প্রতি টিআইবি’র প্রতিবেদনেও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রণে শিক্ষা প্রশাসনের দৈন্যদশার চিত্র ফুঁটে উঠেছে। এই সুযোগে দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার পরিচালনার অনুমতি পেয়ে শিক্ষা ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া কার্যক্রম শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা সংক্রান্ত বিধিমালার বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মমতাজউদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ‘এই বিধিমালার ফলে বিদেশের নামসর্বস্ব ও শিক্ষা ব্যবসায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের সুযোগ পাবে, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির উচিৎ নিজেদের ব্যর্থতা গুঁছিয়ে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিশ্চিত করা ও সনদ বাণিজ্য বন্ধে মনোযোগী হওয়া। কারণ সত্যিকার অর্থে দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা চালুর মতো বাস্তবতা এখনও দেশে হয়নি।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ৩১ মে ‘বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা-২০১৪’ শীর্ষক গেজেট জারি করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা খোলার অনুমোদন পাচ্ছে না। অথচ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার ক্ষেত্রে এই বিধি শীতিল করা হয়েছে, যার ফলে বিতর্কিত ও একপেশে এই বিধিমালা তৈরির পর থেকেই দেশের অপেক্ষাকৃত সফল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা এর বিরোধীতা করে আসছিলেন। কিন্তু তাদের কোন অভিযোগ, অনুযোগ ও দাবিকেই আমলে নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এক বা একাধিক বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েট ও আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে ডিগ্রি, প্রোগ্রাম, কোর্স, ডিপ্লোমা অথবা সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনার সহায়তা দেওয়ার লক্ষে সরকারের অনুমোদনক্রমে দেশে স্থাপিত যেকোনো সেন্টারকে বোঝাবে। এ ধরণের সেন্টার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার লক্ষ্যে ক্লাস পরিচালনা ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সনদ প্রদান করবে পারবে, যা বিধিমালায় বলা হয়েছে। তবে স্টাডি সেন্টার কোনোক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রোগ্রামের সনদ দিতে পারে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বেনজির আহমেদ বলেন, ‘স্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে বিধিমালা আছে -যেমন নিজস্ব ক্যাম্পাস থাকতে হবে, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও নিজস্ব শিক্ষক-কর্মচারী থাকতে হবে। অথচ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এসব শর্তের আবশ্যকতা নেই। এভাবে হায়ার এডুকেশনের নামে ব্যবসা চলতে পারে না। ভাড়াবাড়িতে ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার খুলে সার্টিফিকেট বিক্রির অনুমোদন দেওয়া যায় না। এর ফলে দেশের টাকা বিদেশে পাচার হবে।’

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, দারুণ ইহুসান বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিসহ প্রায় কমপক্ষে দু’ডজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দীর্ঘদিন ধরে সনদ বাণিজ্য চলছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যত ব্যর্থতা ও অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি। এরমধ্যে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ও স্টাডি সেন্টার খোলার অনুমোদন দেওয়ায় দেশে উচ্চ শিক্ষার নামে সনদ বাণিজ্যের পথ আরো প্রশস্থ হবে। পাশাপাশি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অখ্যাত প্রতিষ্ঠানও শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার খুলে দেশে শিক্ষা-ব্যবসা করার সুযোগ পাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) কাজী সালাউদ্দিন আকবর বলেন, ‘কঠিন কিছু শর্ত আরোপ করেই এই বিধিমালা জারি করা হয়েছে। ভূইপুড় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমোদন দেওয়া হবে না। বিদেশি যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড র‌্যাকিংয়ে ২০০টির মধ্যে থাকবে, কেবল সেগুলোরই শাখা খোলার অনুমোদন দেওয়া হবে।’

বিধিমালায় বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে শাখা ক্যাম্পাস ও স্টাডি সেন্টার পরিচালনা করা যাবে, যার জন্য নির্ধারিত শর্ত মেনে আবেদন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসের জন্য দশ লাখ টাকা এবং স্টাডি সেন্টারের জন্য তিন লাখ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুকূলে নিবন্ধন অর্থাৎ অনুমোদনের জন্য ফি দিতে হবে। পাশাপাশি শাখা ক্যাম্পাসের জন্য পাঁচ কোটি টাকা নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে সংরক্ষিত তহবিলে এবং স্টাডি সেন্টারের জন্য এক কোটি টাকা জমা রাখার শর্ত আরোপ করা হয়েছে বিধিমালায়। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ইউজিসির পরিদর্শন কমিটি নির্ধারিত নিয়ম মেনে সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। তবে শাখা ক্যাম্পাস পরিদর্শনের জন্য দুই লাখ ও স্টাডি সেন্টার পরিদর্শনের জন্য এক লাখ টাকা ফি দিতে হবে ইউজিসিকে। প্রতিবেদন যাচাই বাছাই করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সাময়িক অনুমতিপত্র দিবে, যার মেয়াদ হবে সাত বছর। তবে শর্ত ভঙ্গ করলে অনুমোদন বাতিল বা স্থগিতের বিধান রাখা হয়েছে বিধিমালায়।

এছাড়াও শাখা ক্যাম্পাস স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নিজস্ব অথবা ভাড়া করা ভবনে কমপক্ষে ২৫ হাজার বর্গফুট জায়গা এবং স্টাডি সেন্টারের জন্য নিজস্ব অথবা ভাড়া করা ভবনে নূন্যতম দশ হাজার বর্গফুট জায়গা রাখার কথাও বলা হয়েছে ওই বিধিমালায়।

EH

পছন্দের আরো পোস্ট