গ্রামে থাকতে চান না শিক্ষকরা

ডাক্তারদের মতো শিক্ষকদেরও মফস্বলে থাকতে অনীহা। মফস্বলের কলেজগুলোতে শিক্ষকরা থাকতে চান না।

শিক্ষকদের এই অনীহা দিন দিন বাড়ছে। মফস্বলের অধিকাংশ সরকারি কলেজেই শিক্ষক সংকট চরমে উঠেছে।

এমনও কলেজ রয়েছে, যেখানে পুরো বিভাগে একজন শিক্ষকও নেই। দেশের মোট ২৭১টি সরকারি কলেজের ১৫ হাজার শিক্ষকের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পদ শূন্য হয়ে আছে। এই শূন্যপদ সবই মফস্বলে।

রাজধানীতে পদের চেয়ে দ্বিগুণসংখ্যক শিক্ষক থাকারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংযুক্তি (শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের নির্দেশে কোনো কলেজে যুক্ত থাকা) ও ইনসিট্যু (পদোন্নতির পর সংশ্লিষ্ট পদ না থাকায় আগের পদে বহাল থাকা) নিয়ে মফস্বল ছেড়েছেন আরো প্রায় এক হাজার ২০০ জন শিক্ষক।

তারা রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের পছন্দের কলেজে অতিরিক্ত হিসেবে রয়েছেন। অথচ এসব শিক্ষক যার যার কলেজে ফিরে গেলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই লাঘব হতো।

তবে কোচিং ও প্রাইভেটে মফস্বল শহরে আয় খুব কম হওয়ায় এবং ঢাকামুখী প্রবণতার কারণে শিক্ষকরা মফস্বলে থাকতে চান না বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

রাজধানীর বড় কয়েকটি কলেজের চিত্র দেখলেই সংযুক্তি ও ইনসিট্যুর ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। সরকারি তিতুমীর কলেজে শিক্ষকের পদ রয়েছে ১৭৪টি।

কাগজে-কলমে ২২টি পদ শূন্য দেখানো হচ্ছে।  ফলে শিক্ষক থাকার কথা ১৫২ জন। অথচ সেখানে শিক্ষক আছেন ২১৪ জন। ৬২ জন রয়েছেন সংযুক্তি ও ইনসিট্যু অবস্থায়। এই কলেজে দর্শনে শিক্ষকের ৯টি পদ থাকলেও শিক্ষক আছেন ১৫ জন। সংযুক্তি ও ইনসিট্যু নিয়ে আছেন ছয়জন। দর্শন বিভাগের এ অবস্থার মতোই প্রায় সব বিভাগের পরিস্থিতি।

সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. দিলারা হাফিজ বলেন, ‘সংযুক্তি বা ইনসিট্যু নিয়ে বেশ কিছু শিক্ষক আমাদের কলেজে আছেন। শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে তাদের তেমন কাজে লাগাতে পারছি না। আবার কিছু বিভাগে অতিরিক্ত শিক্ষকের খুব একটা প্রয়োজনও নেই।

ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষকরা ঢাকায় থাকতে চান। তবে ডিও লেটার দিলেই যে বদলি করতে হবে সেটা ঠিক নয়। বদলির জন্য আরো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। আমার মনে হয়, শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিশেষ বিসিএসের ব্যবস্থা করা উচিত।

তাহলে যারা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান তারাই শুধু এখানে আসবেন। এখন যেটা হচ্ছে বিসিএসে পররাষ্ট্র বা পুলিশ বিভাগ না পেয়ে বাধ্য হয়ে শিক্ষকতায় আসছেন। তাদের চেষ্টা থাকে ঢাকায় থেকে অন্য কিছু করা যায় কি না। সে জন্যই মূলত সংযুক্তি ও ইনসিট্যু বাড়ছে।’

বিভিন্ন কলেজ সূত্রে জানা যায়, সংযুক্তি ও ইনসিট্যু নিয়ে শিক্ষকরা যেসব কলেজে রয়েছেন ওই সব কলেজ তাদের মূল কর্মস্থল নয়। যেসব কলেজে তাঁদের মূল পদায়ন সেখান থেকেই তাঁরা বেতন-ভাতা তোলেন।

মূল পদায়নের কলেজ থেকে বেতন-ভাতা তোলায় ওই সব কলেজ কর্তৃপক্ষও নতুন শিক্ষকের চাহিদা দিতে পারছে না।

আবার যেসব কলেজে সংযুক্তি ও ইনসিট্যু নিয়ে এসেছেন এসব কলেজে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক থাকায় তাঁরা অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য হন। তাই তাঁদের তেমন ক্লাস নেওয়ারও সুযোগ নেই।

ফলে মফস্বলে শিক্ষক সংকট তৈরি করে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরে বসে বসেই সরকারি বেতন-ভাতা পাচ্ছেন প্রায় এক হাজার ২০০ শিক্ষক।

প্রাইভেট, কোচিং ও অন্যান্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়িয়ে তারা দিন পার করছেন। কলেজে কোনো দিন আসেন আবার কোনো দিন আসেন না।

রাজধানীর কলেজগুলোর বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের ব্যাপারে অধ্যক্ষের পক্ষেও খোঁজখবর রাখা সম্ভব নয়। কোনো দিন না এসে পরে খাতায় স্বাক্ষর করলেও একজন উচ্চপদস্থ অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপককে কলেজ প্রশাসন কিছু বলতেও পারেন না।

মফস্বলের কোনো একটি কলেজে হয়তো ইংরেজি বিষয়ে একজন শিক্ষক আছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর ওই শিক্ষককেই বদলি করে ঢাকায় নিয়ে আসে। ওই শিক্ষক না থাকায় ওই কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম কিভাবে চলবে তা নিয়ে মোটেই ভাবেন না শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা।

মাউশির বিভিন্ন প্রকল্পেও শিক্ষকদের সংযুক্ত করে মফস্বলের কলেজগুলো শিক্ষকশূন্য করে ফেলা হচ্ছে। শিক্ষকদের বড় কলেজে বদলি ও রাজধানীতে আসার ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা না থাকায় সংযুক্তি নিয়ে শিক্ষকরা সহজেই আসার সুযোগ পাচ্ছেন।
আর সংযুক্তি ও ইনসিট্যুর এই তদবির করছেন বিভিন্ন এমপি, মন্ত্রী, সচিব ও মন্ত্রীর পিএসরা। অনেক ক্ষেত্রেই তদবির ফেলে দিতে না পারায়ও পদায়ন করতে হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির।

আবার রাজধানী ও বিভাগীয় শহরে বদলি ও সংযুক্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষাসচিব ড. মোহাম্মদ সাদিকের কাছে এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব স্বপন কুমার সরকারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তাকে ফোন করা হলে তিনি এ ব্যাপারে সরাসরি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

তবে নাম প্রকাশ না করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব বলেন, ‘সংযুক্তি বা ইনসিট্যু আমরাও দিতে চাই না। কিন্তু এত উচ্চপর্যায় থেকে তদবির আসে যে না দিয়ে পারা যায় না। অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রী বা সমপর্যায়ের কোনো ব্যক্তি যদি রাজধানীর একটি কলেজে কাউকে সংযুক্তি দিতে বলেন তখন আমাদের না দিয়ে উপায় থাকে না।

আমরা জানি, এসব শিক্ষকের কলেজে তেমন কোনো কাজ নেই। তার পরও তাদের স্ব স্ব কলেজে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।’

মাউশি ও বিভিন্ন কলেজ থেকে প্রাপ্ত সূত্রে জানা যায়, সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ১৯টি শিক্ষকের পদ থাকলেও এখন আছেন ৩৮ জন। ১৯ জনই আছেন সংযুক্তি ও ইনসিট্যু অবস্থায়। মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজে শিক্ষকের পদ ১২০টি। সাতটি পদ শূন্য রয়েছে।

সেই হিসাবে শিক্ষক থাকার কথা ১১৩ জন। অথচ আছেন ১৫৮ জন। ৪৫ জন শিক্ষক অতিরিক্ত রয়েছেন। ঢাকা কলেজে শিক্ষকের পদ ১৯৭টি। তবে শূন্য দেখানো আছে ১৯টি পদ। সেই হিসাবে শিক্ষক থাকার কথা ১৭৮ জন। অথচ শিক্ষক রয়েছেন ২২৯ জন। ৫১ জন শিক্ষক অতিরিক্ত রয়েছেন।

সরকারি কবি নজরুল কলেজে শিক্ষকের পদ আছে ৮৪টি। আর শূন্য রয়েছে আটটি পদ। এখানে ৭৬ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন ১১২ জন। ৩৬ জনই আছে সংযুক্তি ও ইনসিট্যু অবস্থায়।

ইডেন কলেজে শিক্ষকের পদ আছে ২১৭টি। ২২টি পদ শূন্য রয়েছে। এখানে ১৯৫ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও শিক্ষক আছেন ৩০০ জন। ১০৫ জনই অতিরিক্ত হিসেবে রয়েছেন। এভাবে রাজধানীর সব কলেজেই অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছে অথচ মফস্বলের ২০টি কলেজ রয়েছে যেখানে একটি বিভাগে একজন শিক্ষকও নেই।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘সংযুক্তি বা ইনসিট্যুর দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। ঢাকা শহরের কলেজের কোনো শিক্ষককেই বদলি করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

আমরা ঢাকার বাইরের লেকচারার ও সহকারী অধ্যাপকদের পদায়ন ও বদলি করতে পারি। সংযুক্তি ও ইনসিট্যুর কারণে মফস্বলের অনেক কলেজেই শিক্ষক নেই। কিন্তু আমাদের তো করারও কিছু নেই। আমরা অসহায়ভাবে শুধু দেখছি।’

EH

পছন্দের আরো পোস্ট