বাংলাদেশে অনলাইনে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে

প্রাচীন ভারতের নালন্দা থেকে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের লাইসিয়াম হলো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বসূরি। আজ একুশ শতকে এসে অনেক কিছুর সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে সেই উচ্চশিক্ষার প্রথাগত ধারণা। দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে এ নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিকের আজ পড়ুন চতুর্থ বা শেষ পর্ব

তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের হয়তো তুলনা চলে না। অনেক দিক থেকে পিছিয়ে বাংলাদেশ। কিন্তু যেসব উপাদান উন্নত বিশ্বের উচ্চশিক্ষার প্রথাগত কাঠামোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে ভাবা হচ্ছে, একই ধরনের উপাদান বাংলাদেশেও বিদ্যমান। এখানেও বাড়ছে উচ্চশিক্ষার ব্যয়, বাড়ছে শিক্ষার্থী, চাকরির বাজারে প্রতিনিয়ত চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে আর সহজলভ্য হচ্ছে প্রযুক্তি।

উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পালেও বদলের হাওয়া লাগতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এখানেও পুরোপুরি না হলেও উচ্চশিক্ষার একটি বড় জায়গা দখল করে নেবে অনলাইন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও খরচ বেশি। এ দুয়ের মধ্যবর্তী পন্থা হতে পারে অনলাইন। তবে অনলাইনে শিক্ষার জন্য মনিটরিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কিছু ল্যাব বা সেন্টার রাখাও জরুরি, যেখানে শিক্ষার্থী মাঝে মাঝে প্রাতিষ্ঠানিক বা হাতে-কলমে শিক্ষা নেবেন।

এ কে আজাদ চৌধুরী মনে করেন, দু-এক বছরের মধ্যে হয়তো বাংলাদেশেও অনলাইন কোর্স চালু হয়ে যাবে। তিনি বলেন, অনেকে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে ‘অ্যাপ্রোচ’ করেছে। তবে এ জন্য সবচেয়ে জরুরি আইন পাস করা।

বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষার খরচ বেড়ে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রতিবছর যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে এটি স্পষ্ট। ইউজিসির ২০০৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি মাথাপিছু ব্যয় ছিল ৭৪ হাজার ৫৯০ টাকা।

২০১২ সালে তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে এক লক্ষ ৮০৯ টাকায়। ২০০৮-এ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের (ইউএসটিসি) শিক্ষার্থীপ্রতি মাথাপিছু ব্যয় ছিল এক লাখ ছয় হাজার ১৭৬ টাকা, ২০১২তে গিয়ে তা দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার টাকায়। এভাবে প্রায় সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীপ্রতি মাথাপিছু ব্যয় বেড়েছে। এটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেওয়া নিজস্ব হিসাব। তবে প্রকৃতপক্ষে বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে এ ব্যয় আরও অনেক বেশি বেড়েছে।

এ ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি আবার দ্রুত অনলাইনের জাল বিস্তৃত হচ্ছে সারা দেশে। বাড়ছে গতি। ব্রডব্যান্ডের পাশাপাশি এসেছে থ্রিজি, ওয়াই-ফাই। স্মার্টফোনও অনেকের হাতের নাগালে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ইতিমধ্যে বলেছেন, সারা দেশে এক লাখ ওয়াই-ফাই জোন সৃষ্টি করা হবে। সব মিলে বাংলাদেশেও প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইনে ঝোঁকার সময় হয়তো খুব বেশি দূরে নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামও মনে করেন, বাংলাদেশেও অনলাইনে উচ্চশিক্ষা হতে পারে। কিন্তু পুরোপুরি অনলাইন-নির্ভর হবে না। হয়তো শ্রেণিকক্ষের প্রত্যক্ষ শিক্ষার প্রয়োজন কম হবে, কিন্তু তা একেবারে উঠে যাবে না।

নজরুল ইসলাম বলেন, অনলাইনে উচ্চশিক্ষা হতেই পারে। এতে চাপও কমে যাবে। বাংলাদেশে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, এটি করসপনডেন্স লার্নিং, সেখান থেকে আরেকটু এগিয়ে গেলেই ভার্চুয়াল জগতে চলে যাওয়া।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এটি করতে পারে। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক, মানবিক বিজ্ঞান বা ব্যবসায় শিক্ষা অনলাইনে হতে পারে। মাঝেমধ্যে স্টাডি সেন্টারে গিয়ে শিক্ষকের পরামর্শ বা লেকচার শুনল, বাকি সব অনলাইনে হবে।
তবে প্রায়োগিক বিজ্ঞান, চিকিত্সা বিজ্ঞান, কৃষি বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো যেখানে ল্যাবেরেটরিতে কাজ করার প্রয়োজন হয় সেগুলো অনলাইনে সম্ভব নয়।

স: ইএইচ

পছন্দের আরো পোস্ট